spot_img
More
    Home Blog

    বাচ্চার খাওয়া দাওয়ায় অনীহা

    0

    গল্পের ঝুলি শেষ হলেও শেষ হয় না বাচ্চার মুখের খাবার। ফল দেখলেই নাক কুঁচকোনো, দুধের কথা শুনলেই ছুট্টে পালিয়ে যাওয়া, খেতে বসে শাকসবজি সরিয়ে রাখা নিত্যদিনের অভ্যাস। বাড়ির খুদে সদস্যের মুখে প্রায় কিছুই মুখে না।

    অন্যদিকে চাউমিন, পেস্ট্রি, চিপস এনে হাজির করলে, নিমেষে শেষ। ফলে ক্যালরির হিসেবে একশোয় একশো আর পুষ্টি এক্কেবারে জিরো। বকাঝকা, বোঝানো, শাস্তি সব স্ট্র্যাটেজি ফেল। অগত্যা মায়ের মাথায় হাত, বাবার ভ্রুতে ভাঁজ।

    খাওয়াদাওয়া নিয়ে বায়নাক্কা প্রায় সব বাচ্চাই করে। কিন্তু তাতে বাচ্চাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আপনাকে যদি পুষ্টির নামে রোজ আপেলসিদ্ধ, দুধ-কলা খেতে হয়, তা হলে আপনিও কি রাজি হবেন? ট্যালট্যালে মাছের ঝোল, অখাদ্য তরকারি যদি ভাবেন বাচ্চা নির্বিবাদে খেয়ে নেবে, তা হলে বলব আপনাদের ভাবনাতেই গলদ।

    খেতে বাচ্চা তখনই ভালবাসবে যখন স্বাদে, প্রেজেন্টেশনে আপনি ফুল মার্কস পাবেন। আর তার সঙ্গে চাই একটু বুদ্ধি, একটু স্ট্র্যাটেজি। বাচ্চারা দায়িত্ব নিতে ভালবাসে। খাওয়াদাওয়ার ব্যপারটায় ওকে ইনভলভ করুন। তা হলেই দেখবেন আপনি ও বাচ্চা একই প্ল্যাটফর্মে আছেন।

    মেনু সিলেকশন
    প্রতি সপ্তাহে বাচ্চাকে নিয়ে বসে সারা সপ্তাহের মেনু প্ল্যান করুন। প্ল্যান করতে বসে গল্প করে বুঝিয়ে দিন ব্যালেন্সড ডায়েটে কী ধরনের খাবার থাকা উচিত, সেগুলো খেলে ওর কী উপকার হবে ইত্যাদি। হেলথ ফুড সংক্রান্ত বই, পত্রপত্রিকা বা ওয়েবসাইটও একসঙ্গে ঘাঁটাঘাটি করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন আপনার কথাগুলো যেন পড়ার বইয়ের মতো না শোনায়। রোজকার খাবারের মধ্যে স্বাস্থ্যকর কিন্তু মুখোরোচক খাবার, যেমন ফ্রুট স্যালাড, মিল্ক শেক, ভেজিটেবল পরোটা অবশ্যই রাখবেন। ওকে বাদ দিয়ে নিজেরা বাইরের খাবার খাবেন না। বুঝতে পারলে ও কিন্তু প্রতারিত বোধ করবে এবং অবাধ্য হবে। বাড়ির সবাই একসঙ্গে খেতে বসুন এবং একই খাবার খান। সপ্তাহে একদিন ওর পছন্দমতো জাঙ্কফুড খেতে দিন।

    শপিং স্প্রি
    ছুটির দিনে বাড়ির বাজার করার সময় বাচ্চাকে সঙ্গে করে নিয়ে যান। বাজার করার সময় নানা ধরনের সবজি, ফল, মাছ ইত্যাদি চেনাতে থাকুন। বিভিন্ন খাবারের রং, আকার, গন্ধ, স্পর্শ বুঝতে সাহায্য করুন। বিভিন্ন রঙের সবজি, ফল একসঙ্গে বেছে কিনে আসুন। রান্না করার সময় ওর সাহায্য নিন, তা যত সামান্যই হোক। দেখবেন নিজের পছন্দ করা খাবার ও আনন্দ করেই খাবে। একটু বড় বাচ্চা হলে কয়েকটি সহজ অথচ পুষ্টিকর রেসিপি শিখিয়ে দিন। সবাই মিলে খেতে বেশ মজাই লাগবে।

    হেলদি ডায়েট
    বাচ্চাদের ডায়েটে ক্যালশিয়াম একটি অত্যন্ত জরুরি উপাদান। টোনড দুধ ঠান্ডা করে ওর পছন্দমতো ফ্লেভার মিশিয়ে দিতে পারেন। বাড়িতে তৈরি অল্প মিষ্টি দেওয়া আইসক্রিমও সুস্বাদু। কাসটার্ড, পুডিংও চলতে পারে। এ ছাড়া টিফিনে চিপস বা বার্গারের বদলে চিজ স্যান্ডউইচ বা ভেজিটেবল ক্যাসারোল জাতীয় মুখোরোচক খাবার দিন।

    স্কুল থেকে ফিরে সফট ড্রিঙ্কের বদলে ফ্রেশ ফ্রুট জুস বা বাড়িতে তৈরি লেবুর শরবত করে খাওয়ান।

    শীতের দিনে নানারকম মরশুমি সবজি দিয়ে গরমাগরম স্যুপ দিনের যে কোনও সময় খাওয়া যেতে পারে।

    টক-মিষ্টি রায়তা বা ডিপ বানিয়ে শসা, টমাটো, পেঁয়াজ এবং অন্যান্য ফল মিশিয়ে স্ন্যাকস হিসেবে সার্ভ করুন।

    বাড়িতে চকোলেট, টফি, মিষ্টি বা পেস্ট্রিজাতীয় জিনিস ফ্রিজে বেশি পরিমাণে স্টক করে রাখলে বাচ্চারা বারণ করা সত্ত্বেও খাবে। কোথাও বেড়াতে বেরলে এগুলো অকেশনাল ট্রিট হিসেবে থাকুক।

    শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের ধাপ

    0

    লেখক: ডাক্তার সেজুতি

    শিশু মানেই সুন্দর, শিশু মানেই পবিত্র। জন্মের পর সব মা–বাবারই আগ্রহ থাকে শিশু কবে হামাগুড়ি দিবে, কবে উঠে বসবে, কখন হাঁটা শিখবে, কবে কথা বলা শিখবে। এগুলো শিশুর শারীরিক বিকাশ। এই শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী তার মানসিক বিকাশও ঘটে। এভাবে ধাপে ধাপে বেড়ে ওঠাকেই শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ বলা হয়। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে সব শিশুর গ্রোথ সেইমভাবে হয় না। তবে বেশিরভাগ শিশু নির্দিষ্ট বয়সে নির্দিষ্ট মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলে। চলুন জেনে নেই ৬-১২ মাস বয়সী শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের মাইলস্টোন সম্পর্কে।

    ডেভেলপমেন্টাল মাইলস্টোন কী?  

    ডেভেলপমেন্টাল মাইলস্টোন হলো বয়স অনুযায়ী শিশুর যেভাবে বেড়ে ওঠার কথা (শারীরিক ও মানসিকভাবে), সেই দক্ষতাগুলো ঐ বয়সের মধ্যেই অর্জন করা। শিশুর বিকাশ একটি চলমান প্রসেস। বিকাশের স্তর বা মাইলস্টোন অনুযায়ী শিশু একেকটা বয়সে একেকটা কাজ করবে। আর এটা থেকেই বোঝা যাবে যে শিশু স্বাভাবিক ও সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে। যেমন- একটি শিশুর ওজন জন্মের পর ৫ থেকে ৬ মাসের মধ্যে দ্বিগুণ হবে এবং তার প্রথম জন্মদিনে তিনগুণ হবে। এটা হচ্ছে বাচ্চার ওয়েট গেইনের মাইলস্টোন। শিশুর ১ মাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের জন্য এমন নির্দিষ্ট কিছু মাইলফলক আছে।

    শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বিলম্ব হচ্ছে কিনা, তা কীভাবে বুঝবেন?

    শিশুর বিকাশ বলতে বোঝায় কীভাবে একটি শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে সক্ষমতা অর্জন করে। এখানে শুধুমাত্র শিশুর ওজনে বা আকারে বড় হওয়াকেই বোঝায় না। যখন আমরা স্বাভাবিক বিকাশের কথা বলি, তখন শারীরিক ও মানসিক উভয় দিকই খেয়াল করবো। সব শিশুর বিকাশ একই গতিতে হবে এমনটি কিন্তু নয়, একটু এদিক সেদিক হতে পারে।

    ১-২ মাস বয়সী শিশুদের বিকাশ  

    • হাত মুখের কাছে আনা
    • ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি দূরের বস্তুগুলোতে ফোকাস করা
    • হঠাৎ আওয়াজে চমকে যাওয়া
    • চোখের দৃষ্টি কোনো জিনিসের উপর স্থির করে রাখা
    • হাত-পা সমানভাবে নাড়ানো
    • মাথা একদিকে ফিরিয়ে চিত হয়ে শোয়া

    ৬-১২ মাস বয়সী শিশুদের বিকাশ

    ৬ মাসে শিশুর ডেভেলপমেন্ট

    ১) উপুড় হওয়া ও সাপোর্ট দিয়ে বসা

    এই বয়সে শিশুরা চিত থেকে উপুড় বা উপুড় থেকে চিত হতে পারে। পেছনে সাপোর্ট বা ঠেকা দিয়ে অল্প সময়ের জন্য বসতে পারে। কিছু বাচ্চা সাপোর্ট ছাড়াও বসতে পারবে, তবে এতে ৯ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাই না বসতে পারলেও চিন্তার কিছু নেই।

    ২) পায়ের উপর ভর নিতে পারা 

    এই বয়সের শিশুকে উঁচু করে ধরলে পায়ে কিছু ভার নিতে পারে। সে তার নাগালের বাইরের জিনিস পেতে চাইবে, কোনো কিছু ধরে দাঁড়াতে চাইবে।

    ৩) কিছু অনুভূতি প্রকাশ করা

    বিভিন্ন শব্দ করে সে তার খুশি বা কষ্ট প্রকাশ করবে। আবার রেগেও যেতে পারে! হাত উঁচু করে কোলে উঠতে চাইবে। নিজের নাম বুঝতে পারবে, কেউ তার নাম ধরে ডাকলে সেদিকে তাকাবে। ওহ, আহ বা বিভিন্ন ধরনের সাউন্ড (বাবলিং) করতে পারবে।

    ৪) হাতের জিনিস মুখে দেওয়া
    ৬-১২ মাস বয়সী শিশুদের বিকাশ

    এই বয়সের বাচ্চারা হাতের জিনিস মুখে দিবে, এক হাত থেকে অন্য হাতে নিবে। নতুন জিনিসে কৌতুহল দেখাবে এবং হাতে ধরেই আগে মুখে দেওয়ার চেষ্টা করবে।

    ৫) পরিচিত মুখ চিনতে পারা

    মা-বাবা বা পরিবারের অন্যান্যদের সে চিনতে শিখে। বাইরের লোক বা অপরিচিতদের দেখলে ভয় পাবে এবং কান্নাও করতে পারে। সাধারণত এই বয়সে বাচ্চারা কোনো কমান্ড বা নির্দেশ বুঝে না, তবে আপনি তার সাথে খেললে বা ছড়া শোনালে সে হাসবে।

    ৯ মাসে শিশুর ডেভেলপমেন্ট

    ১) সাপোর্ট ছাড়াই বসতে পারা

    সাধারণত ৯ মাসের মধ্যেই শিশুরা একা একা বসতে শিখে যায় এবং বিছানায় রোলিং করতে পারে। শোয়া থেকে বসার অবস্থানে যেতে পারাটাও এই বয়সের মাইলস্টোন।

    ২) হামাগুড়ি দেওয়া

    এই বয়সে বাচ্চারা হামাগুড়ি দেওয়া এবং কোনো কিছু ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে শিখে। তবে অনেক বাচ্চারা হামাগুড়ি দেয় না, একবারে হাঁটা শিখে ফেলে। একেক বাচ্চার ডেভেলপমেন্ট একেকভাবে হয়।

    ৩) হাত দিয়ে ইশারা করা

    এই বয়সের বাচ্চারা হাত দিয়ে ইশারা করতে পারে। তর্জনী ও বুড়া আঙুল দিয়ে কোনো জিনিস আঁকড়ে ধরতে পারে। খেলনা এক হাত থেকে আরেক হাতে নেয়। কালারফুল জিনিস হাত বাড়িয়ে ধরতে চায়।

    ৪) ছোট্ট ছোট্ট শব্দ বলা শুরু করা

    মা, বাবা, মামা, দাদা এই ধরনের ছোট পরিপূর্ণ শব্দ বলা শুরু করবে বা বলার চেষ্টা করবে।

    ১২ মাসে শিশুর ডেভেলপমেন্ট

    ১) হাঁটতে শেখা

    কোনো কিছু না ধরে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়াতে পারবে। সাধারণত এই বয়সের শিশুরা হাত ধরে হাঁটতে পারে, অনেক বাচ্চারা হাঁটা শিখেও যায়। তবে না হাঁটলে চিন্তার কিছু নেই। ১৫ মাসের মধ্যে বাচ্চারা ভালোভাবে হাঁটা শিখে যায়।

    ২) নির্দেশ বুঝতে পারা 

    এই বয়সে বাচ্চারা সাধারণ নির্দেশগুলো বুঝতে শিখে যায়। কোনো শব্দ বললে সেটা সে অনুকরণ করতে চাইবে। কোন জিনিস দিয়ে কী করে, সেটাও বুঝে যায়। যেমন- স্পুন দিয়ে খাবার খাওয়া, ফিডারে দুধ খাওয়া, চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ানো, এই ছোট খাটো বিষয়গুলো বুঝতে পারে। সে তার নিজস্ব এক্সপ্রেশনও দিতে পারবে।

    ৩) মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বলা 

    ১ বছর বয়সী বাচ্চারা মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বলা শিখে যায়, হাত দিয়ে টাটা দেয়। এই সময়ে হাতে বেশ দক্ষতা আসে। সে একা একা কোনো পাত্রে জিনিস রাখতে ও বের করতে পারবে।

    এছাড়াও এক বছরে বাচ্চাদের কয়েকটা দাঁত উঠে যায় বা দাঁত ওঠা শুরু হয়। এই সময়ে তার সব বিষয়েই অনেক কৌতুহল থাকে। নতুন কিছু দেখলে হাত ও পা ব্যবহার করে সেটার দিকে আগাতে চায়। অনেক বেবিরা এই বয়সে কয়েকটি অর্থপূর্ণ শব্দ বলা শিখে যায়।

    তো এই ছিলো ৬-১২ মাস বয়সী শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের ধাপ। তবে যারা প্রিম্যাচিউর বেবি তাদের ক্ষেত্রে এই মাইলস্টোনগুলো ছুঁতে একটু ডিলে হতে পারে। অথবা জেনেটিক্যাল ইস্যু, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে বাচ্চাদের এই ডেভেলপমেন্ট স্টেজে একটু লেইট হতে পারে। যেমন অনেক স্বাভাবিক বাচ্চাও ১৬ মাসে পরিপূর্ণভাবে হাঁটা শিখে। তবে যদি আপনার বাচ্চার আচরণে অস্বাভাবিক কিছু দেখেন বা বয়স অনুযায়ী কোনো মাইলফলকে সে না পৌঁছে, তাহলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

    শিশুর হাম এবং চিকিৎসা

    0

    লেখক: ডাক্তার মারুফা আক্তার

    বসন্তের মতো হামও খুব পরিচিত একটি অসুখ। তবে বসন্ত এখন আর দেখা না গেলেও হাম প্রায়ই দেখা যায়। এটি একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। রোগটি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, তৈরি হতে পারে নানা জটিলতা। সাধারণত শিশুরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। তবে বড়রাও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সুস্থ শিশুদের ক্ষেত্রে হাম একটি নিরীহ রোগ। তবে পুষ্টিহীন শিশুরা হামে আক্রান্ত হলে এর পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ, এমনকি এর ফলে শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আজকের আর্টিকেলে জানাবো শিশুর হাম হলে পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে এবং এই রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে।

    কোন কারণগুলোর কারণে হাম হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়?

    টিকা না দিলে 

    শিশুকে হামের প্রতিষেধক টিকা দেয়া না থাকলে এই রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। তাই টিকা দেয়ার ব্যাপারে অভিভাবকের সচেতন থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি। শৈশবে টিকা দেয়া না হলে বড় হওয়ার পরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়ে যায়।

    ভিটামিন এ এর অভাব হলে

    ভিটামিন এ এর অভাবে শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। শরীরে এই ভিটামিনের ঘাটতি হলে হামের জটিলতা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তাই শিশুদের খাদ্য তালিকায় ভিটামিন এ যুক্ত খাবার অবশ্যই রাখুন।

    রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে

    শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিতেই কম থাকে। তাই যে কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তাদের বেশি। বড়দের মধ্যে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল যেমন- লিউকেমিয়া বা এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তির হামের ঝুঁকি বেশি থাকে এবং জটিলতা বেশি দেখা দেয়।

    হাম প্রাদুর্ভাবযুক্ত দেশে ট্রাভেল করলে 

    আপনার যদি ট্রাভেলিং এর অভ্যাস থাকে এবং যদি এমন কোনো দেশে ঘুরতে যান যেখানে হামের প্রাদুর্ভাব বেশি, তাহলে আপনিও হামের জীবাণুর মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারেন। শিশুরাও যদি বাবা-মায়ের সাথে এমন দেশে ভ্রমণ করতে যায় তাহলে সেক্ষেত্রে তারাও ঝুঁকিতে থাকে।

    হামের উপসর্গ 

    ১) প্রথমে দুই থেকে তিন দিন তীব্র জ্বর, সর্দি-কাশি ও ক্লান্তি থাকে।

    ২) শরীর ম্যাজম্যাজ করে এবং ব্যথা হয়।

    ৩) চোখ লাল হয়ে যায়।

    ৪) চোখ দিয়ে পানি পড়ে।

    ৫) হাঁচি, কাশি ও গলা ব্যথা হয়।

    ৬) নাক দিয়ে অনবরত পানি বা সর্দি পড়ে।

    ৭) খাবারে অরুচি হয়।

    ৮) ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে শরীরে লালচে র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এই ফুসকুড়ি কানের পিছন দিক থেকে শুরু করে মুখ, পেট, পিঠ, হাত-পা ও সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

    ৯) মুখের ভেতরে গালের দিকে সাদাটে বা লালচে বৃত্তের মতো দাগ দেখা যেতে পারে। একে কপলিক স্পটও বলা হয়ে থাকে।

    হামের জটিলতা

    অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশু বড় কোনো জটিলতা ছাড়াই হাম থেকে মুক্তি পেয়ে যেতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হামে শিশু মৃত্যুর হার ১-৩ শতাংশ। তবে জটিলতা দেখা দিলে সেটি ১৫ শতাংশে গড়াতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানপাকা, কর্নিয়ার ক্ষত, নাকে-মুখে ঘা, অপুষ্টি, সেপটিসেমিয়া (রক্তে ইনফেকশন ছড়িয়ে যাওয়া) এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ বা এনকেফালাইটিস এর মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় হাম হলে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। এর ফলে সময়ের আগেই বাচ্চা হয়ে যাওয়া, অপুষ্ট শিশুর জন্ম এমনকি গর্ভপাতসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।

    এই রোগের চিকিৎসা কী? 

    ১) সারা শরীরে র‍্যাশ পুরোপুরি ওঠার পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যে মিলিয়ে যেতে শুরু করে। ত্বকের চামড়া উঠে যায় এবং বাদামি দাগ পড়ে যায়। প্রথম কয়েকদিন প্রচন্ড জ্বর থাকে। জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল, অ্যান্টিহিস্টামিন, ভিটামিন-এ এবং প্রয়োজনে অ্যান্টিভাইরাল মেডিসিন সেবন করা যেতে পারে।

    ২) হামের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজ করে না, তবে হামের কারণে অন্য কোনো ইনফেকশন যেমন- কানে বা রক্তে ইনফেকশন হলে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া যেতে পারে। তবে যে মেডিসিনই দেয়া হোক না কেন অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করতে হবে।

    ৩) এ সময় শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে শিশুকে প্রচুর তরল খাবার ও পানি খাওয়ানো জরুরি।

    ৪) সঠিক চিকিৎসা, তরল খাবার ও প্রচুর পানি পানের মাধ্যমে ১০/১২ দিনের মধ্যেই সাধারণত হাম সেরে যায়।

    ৫) পরিবারের বাকি সদস্যদের মধ্যে সংক্রমণ এড়াতে আক্রান্ত ব্যক্তি বা শিশুকে র‍্যাশ মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত আলাদা রাখতে হবে।

    যে বয়সে টিকা দেয়া জরুরি 

    শিশুর যদি হামের টিকা না দেয়া থাকে এবং পূর্বে কখনো তার হাম না হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে এ রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শে গেলে শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৯০% বেশি থাকে। সময়মতো অর্থাৎ শিশুর নয় মাস পূর্ণ হলে এবং ১৫ মাসে হামের টিকা দেওয়া জরুরি। আগে একবার হামের টিকা দেওয়া হতো। কিন্তু একবার টিকা দিলে প্রায় ৯৩% সফলতার সম্ভাবনা থাকে। তবে দুই ডোজ দিলে এটি বৃদ্ধি পেয়ে ৯৭% হয়। তাই দুই ডোজ টিকা দেওয়া জরুরি। আবার টিকা দেওয়ার পদ্ধতিতে ভুল থাকলে কিংবা সরকারি অনুমোদনহীন কোনো হাসপাতাল থেকে টিকা দিলেও এর কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে। তবে টিকা দেওয়ার পরও হাম হয়ে গেলে এ নিয়ে খুব চিন্তিত হবেন না। এর চিকিৎসা বা জটিলতা সাধারণ হামের মতোই। যেসব নারীর টিকা নেওয়া হয়েছে বা যারা হামে আক্রান্ত হওয়ার কারণে ইতিমধ্যেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন, তাদের শিশুরা সাধারণত জন্মের প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত হাম থেকে সুরক্ষিত থাকে।

    হাম সাধারণত অল্প সময়েই সেরে যায়। তবে এ রোগ প্রতিরোধে সচেতন থাকা জরুরি এবং অবশ্যই সময়মতো টিকা নিতে হবে। শিশুদের মতো বড়রাও হামে আক্রান্ত হতে পারে। ভয় না পেয়ে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ওষুধ গ্রহণ করা উচিত। সবাই সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।

    শিশুর ওজন অতিরিক্ত বেড়ে গেলে করণীয় কী?

    0

    লেখক:ডাক্তার মারুফা আক্তার

    সুখী ও সুন্দর জীবনের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন শারীরিক সুস্থতা। সুস্থ থাকতে দরকার স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাত্রা ও পরিমিত ওজন। যারা হেলদি লাইফস্টাইল মেনটেইন করেন না, খাবারের ক্ষেত্রে অনিয়ম করেন এবং শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলেন, খুব সহজেই তাদের শরীরে অতিরিক্ত মেদ বা চর্বি জমে যায়। অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির এই সমস্যাকে বলা হয় ওবেসিটি। বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই অনুযায়ী দেহের উচ্চতার বিবেচনায় ওজন বেড়ে গেলে তখনই তা চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও এমনটা হয়ে থাকে! আজকের টপিক চাইল্ড ওবেসিটি নিয়ে। কেন বাচ্চাদের ওয়েট বেড়ে যায় এবং কীভাবে সেটা কন্ট্রোল করা যায়, সেই বিষয়গুলো নিয়ে আজকের আলোচনা।

    যেসব কারণে ওজন বাড়ে

    শিশুদের অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি বা মুটিয়ে যাওয়ার কারণ কী, চলুন প্রথমেই সেগুলো জেনে নেওয়া যাক-

    • জেনেটিক্যাল ইস্যু
    • হরমোনের অসামঞ্জস্যতা
    • পারিপার্শ্বিক পরিবেশ
    • সারাদিন শুয়ে বসে থাকা
    • অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা
    • বাইরে খেলাধুলা না করা
    • অতিরিক্ত কোমল পানীয় পান এবং চকোলেট, ডোনাট, চিপস, বার্গার ইত্যাদি ফাস্টফুড নিয়মিত খাওয়া

    মানসিক চাপের কারণেও শিশুর ওজন বাড়তে পারে। একঘেয়েমি জীবনযাত্রার কারণে বা কোনো বিনোদন ব্যবস্থা না থাকায় অনেক বাচ্চারাই ঘরে বসে অতিরিক্ত খাবার খায়। কিন্তু শারীরিক পরিশ্রম না হওয়ার কারণে সেই ফ্যাট বার্ন হয় না। তাই ওজন বেড়ে যায়। স্টেরয়েড জাতীয় মেডিসিন দীর্ঘদিন যাবত সেবনেও ওজন বাড়তে পারে।

    কম খেলেও বাড়ছে ওজন?

    পরিমাণে কম খেলেও ওজন বাড়তে দেখা যায় অনেক বাচ্চার। এ ক্ষেত্রে ধীরে খাবার হজম হওয়াকে দায়ী করা যেতে পারে। দেখা যায় অনেক বাচ্চারা একই স্থানে বসে দীর্ঘ সময় টেলিভিশন দেখে, তাদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়। ছোটাছুটি না করলে হজমের সমস্যা দেখা দেয়। অনেকে আইসক্রিম, মিল্ক চকোলেট, বার্গার, তেলে ভাজা খাবার ইত্যাদি ফাস্টফুড রেগুলার খেয়ে অভ্যস্ত। এসব খাবারে উচ্চমাত্রায় ক্যালরি থাকে। তাই এসব খাবার অল্প খেলেও শরীরে অধিক মাত্রায় ক্যালরি জমা হয়। ফলে পরিমাণে কম খেলেও ওজন বেড়ে যায়।

    চাইল্ড ওবেসিটি কি জটিল কোনো সমস্যা?

    চাইল্ড ওবেসিটি থাকলে সাধারণত কিছু জটিলতা দেখা দেয়-

    • টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়
    • রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়
    • উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা দেখা দেয়
    • কোমর ও জয়েন্টে জয়েন্টে পেইন হয়
    • ঘুমের মধ্যে নাকডাকার সমস্যা ও শ্বাসকষ্ট হয়
    • পিত্তথলিতে পাথর বা ইনফেকশন হয়
    • শারীরিক ও মানসিক অবসাদ দেখা দেয়
    • ঘাড় ও ত্বকের ভাঁজে ভাঁজে কালো দাগ দেখা দেয়
    • চর্বি জমে লিভারের স্থায়ী সমস্যা হতে পারে

    এছাড়াও অল্প বয়সেই ছেলে শিশুদের দাঁড়ি গোফ ওঠা বা মেয়েদের মাসিক শুরু হয়ে যাওয়া এবং অবাঞ্চিত লোম গজানোর মতো বিব্রতকর সমস্যা হতে পারে। তাহলে আপনি এখন নিজেই বুঝতে পারছেন যে চাইল্ড ওবেসিটি গুরুত্বর সমস্যা কিনা!

    চাইল্ড ওবেসিটি প্রতিরোধে মা-বাবার করণীয় 

    ১) শিশুর ওজন বৃদ্ধি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে একটি ওয়েট চার্ট রাখতে হবে। বয়স অনুযায়ী বাচ্চার ওয়েট কেমন হওয়া উচিত, সেটা ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন।

    ২) স্কুল যদি বাসার কাছে হয়, তাহলে গাড়ি বা রিকশা ব্যবহার না করে শিশুকে হেঁটে যাতায়াতের অভ্যাস করুন।

    ৩) কৌটার দুধ বা শুধুমাত্র প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ালে অল্প বয়সেই শিশু ওবেসিটিতে ভুগতে পারে। তাই শিশুকে ছয় মাস পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ান। ছয় মাস পূর্ণ হলে ঘরে বানানো পুষ্টিকর খাবার ও ফলমূল পরিমিত পরিমাণে দিতে হবে। বাড়ন্ত শিশুকে ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, চকোলেট, আইসক্রিম, সসেজ, ফ্রোজেন স্ন্যাকস প্রভৃতি বাইরের খাবার যতটা সম্ভব কম দিতে হবে।

    ৪) শিশুকে নিজের কাজ নিজে করতে উৎসাহিত করতে হবে এবং বাইরে খেলাধুলার সুযোগ করে দিতে হবে। সারাদিন যেন টিভির সামনে বসে না থাকে বা ডিভাইসে আসক্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

    ৫) লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ির ব্যবহার, প্রতিদিন বাইরে খোলামেলা পরিবেশে খেলাধুলা করা, বাড়ির কাজে শিশুর অংশগ্রহণ ইত্যাদি শিশুকে ফিট থাকতে সাহায্য করবে।

    বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন 

    শিশু বেশি মুটিয়ে যাচ্ছে বা অতিরিক্ত ওজনের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, এমনটা সন্দেহ হলে অবশ্যই শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। তিনি উচ্চতা ও ওজন মেপে এবং প্রয়োজনে অন্যান্য টেস্ট করে বলতে পারবেন যে আপনার শিশু আসলেই ওবেসিটির দিকে যাচ্ছে কিনা। কোনো হরমোনাল প্রবলেম থাকলে সেটাও বোঝা যাবে। তাই চাইল্ড ওবেসিটি থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

    অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপ হলো খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন। ফাস্টফুড পরিহার করে ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার গ্রহণ করুন এবং শিশুকেও এই ব্যাপারে উৎসাহিত করুন। সুষম খাবার গ্রহণ ও শরীরচর্চার মাধ্যমেও ওজন নিয়ন্ত্রণে না এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না! আজ এই পর্যন্তই, ভালো থাকবেন।

    শিশুর দেরিতে কথা বলার কারণ ও করণীয়

    0

    লেখকঃ নন্দিনী

    শিশুর দেরিতে কথা বলা সমস্যাটি নিয়ে আমাদের সমাজে অনেকের-ই স্বচ্ছ ধারণা নেই। আমার ছেলে আর অনুপ্রিয়ার ছেলের কথাই ধরুন, ওদের জন্ম একই মাসে। ১০ দিন আগে আর পরে। আমার ছেলে দেড় বছর বয়সে মোটামুটি আধো আধো বাক্যগঠন করা শুরু করে দিয়েছিল। অনুপ্রিয়ার ছেলে টুকটাক শব্দও বলতো না।

    আমি ওকে বুঝাতাম, একেকটা বাচ্চা একেক রকম একেকজনের ডেভেলপমেন্টের টাইমিং একেকরকম। কিন্তু যখন আমার ছেলের ৪ বছরের জন্মদিনে ওরা এলো আর তখনো ওর ছেলেটা মাঝে-মধ্যে “আম্মা”, “দাও”, “খাবো” এই দু-চারটে শব্দ ছাড়া আর কোন কথাই বলছিল না তখন আমিও টেনশনে পড়ে গেলাম। কারণ আমার ছেলে অলরেডি স্কুলে যায়, প্লেগ্রুপে পড়ে, ওর সমবয়সী সব বাচ্চাই এখন চটরপটর সারাদিনই কথা বলে।

    ছোট শিশুদের বেড়ে ওঠার কিছু মাইলস্টোন থাকে। যেমন- একটি নির্দিষ্ট বয়সে শিশুরা উপুড় হওয়া শেখে, বসা শেখে, হামাগুড়ি দেয়া শুরু করে, সেভাবেই একটি নির্দিষ্ট বয়সে তারা কথা বলা শুরু করে। ঐ বয়সে বা তার কিছু পরে যদি শিশুরা কথা বলা শুরু না করে তাহলে অবশ্যই বাবা-মাকে এই ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। চলুন তবে শিশুর দেরিতে কথা বলা নিয়ে আজ বিস্তারিত আলোচনা করা যাক!

    লেইট টকিং চিলড্রেন কারা?

    Speech Language Hearing Association, USA’র মতে, সদ্য কথা বলা শিশুর মধ্যে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ যোগাযোগের ভাষা ব্যবহারে সমস্যা দেখা দেয়। সাধারণত ছেলে শিশুদের তুলনায় মেয়ে শিশুরা দ্রুত কথা বলতে শেখে। কিন্তু যদি কোনো শিশু ১৮ থেকে ২০ মাস পার হওয়ার পরও দিনে ১০টির কম শব্দ বলে বা ২১ থেকে ৩০ মাস পার হওয়ার পর দিনে ৫০টিরও কম শব্দ ব্যবহার করে, তাহলে তাদের ‘লেইট টকিং চিলড্রেন’ (Late Talking Children) বলা হয়।

    শিশুর দেরিতে কথা বলা শুরু হয় কি কারণে?

    ১. শিশু বংশগত কারণে দেরিতে কথা বলা শুরু করতে পারে।

    ২. মস্তিষ্কের জন্মগত ত্রুটি।

    ৩. প্রসবকালীন জটিলতা।

    ৪. প্রসবোত্তর স্বল্পকালীন অসুখ যেমন – ভীষণ জ্বর, খিঁচুনি, জীবাণু সংক্রমণ, মস্তিকের ভেতর জীবাণু সংক্রমণ ইত্যাদি।

    ৫. জিহ্বার ত্রুটির কারণে অনেক শিশু ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না।

    ৬. বাচ্চার মানসিক প্রতিবন্ধকতা থাকলে শিশু দেরিতে কথা বলা শেখে।

    ৭. বাচ্চার সামনে ঝগড়া করলে বা অত্যধিক উচ্চস্বরে কথা বললে নার্ভাসনেসের কারণে তাদের কথা জড়িয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে।

    শিশুর প্রথম বুলি

    বাচ্চা কথা বলার শুরুটা হয় কিছু টুকরো টুকরো বিচ্ছিন্ন বর্ণ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। শিশু প্রথমে সাধারণত তা, কা, মা এসব বর্ণ উচ্চারণ করে, যার তেমন কোনো অর্থ থাকে না। ছয় থেকে আট মাস বয়সে ধীরে ধীরে এ বর্ণগুলো এক একটি শব্দে রূপ পায়, যা কখনো কখনো অর্থপূর্ণ, কখনো বা না। যেমন – মামা, চাচা, কাকা, দাদা ইত্যাদি। এটা সাধারণত শিশুরা শুরু করে ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে।

    শিশুর দেরিতে কথা বলা সমস্যা ও আমাদের করণীয়

    ১. শিশু যখন থেকে কথা বলার চেষ্টা করা শুরু করবে, ঐ সময় পরিবারের সকলকেই শিশুকে বেশি সময় দিতে হবে। শিশুর আধো আধো বুলির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মা-বাবা এবং পরিবারে যদি অন্য কোন সদস্য থাকে তাদেরকেও তার সঙ্গে অনেক কথা বলতে হবে। স্পষ্ট এবং শুদ্ধ উচ্চারণে যতটা সম্ভব।

    ২. শিশু কোনো কথা ঠিকভাবে বলতে না পারলে নিজের মতো করেই উচ্চারণ করে। এতে বাড়ির মানুষেরা অনেক সময় খুশি হয়ে থাকেন এবং সবাই দেখা যায় আদরের শিশুটির সাথে তাল মিলিয়ে ভুল উচ্চারণেই শব্দগুলো উচ্চারণ করতে থাকেন। কিন্তু এতে করে কিন্তু ক্ষতিটা শিশুরই হয়। সে ভুল বললে বড়রা সেটা অবশ্যই ঠিক করে বলবে যেন শিশুটি শুনতে শুনতে ঠিক করে বলে।

    ৩. শিশুকে কথা না বলতে পারা বা ভুলভাবে বলার জন্য ধমক দেয়া যাবে না। এতে শিশুর মধ্যে ভয় দানা বাঁধে এবং পরে সে কথা বলতে অনাগ্রহী হয়ে যেতে পারে। তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়। শিশুর কথা বলা শেখার জন্য তার সঙ্গে বেশি করে কথা বলার কোনো বিকল্প নেই। শিশুকে বারবার শোনাতে হবে নানা ধরণের ছড়া বা ঘুমপাড়ানি গান। একসময় সে হয়তো নিজের মতো করেই ওগুলো বলতে চেষ্টা করবে।

    ৪. তাকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চেনাতে হবে। বিভিন্ন রঙিন বই নিয়ে বইয়ের ছবিগুলোর নাম স্পষ্ট উচ্চারণে বলতে হবে। তাহলে শিশু শুনে শুনে দ্রুত কথা বলা শিখবে। কারণ, শিশুরা শুনে শুনেই কথা বলা শেখে।

    ৫. শিশুরা খেলতে খেলতেও অনেক কিছু শেখে। সঠিক খেলনা বাছাই করাও কিন্তু কথা বলা শেখানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ব্যাটারিচালিত খেলনাগুলোর শিক্ষামূলক উপযোগিতা তুলনামূলক অনেক কম। রঙিন লেগো সেট, কিচেন সেট, রঙিন বই এগুলো বেশ ভালো খেলনা। খেলনাগুলোর কোনটা কী রং সেগুলো বারবার শিশুকে বলবেন। মা রান্না করার সময় শিশুকে কাছে কিন্তু নিরাপদ দূরত্বে বসিয়ে বিভিন্ন সবজির নাম বলা, মসলার নাম বলা, রং চেনানো, এটাও কিন্তু কথা বলা শেখানোর জন্য ভালো একটা পন্থা।

    ৬. তবে সব চেষ্টা করা এবং শিশুর দুই বছর পার হবার পরেও কথা না বলে তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্পিচ থেরাপির সহযোগিতা নেয়া ভালো।

    স্পিচ থেরাপি কী?

    স্পিচ থেরাপি হচ্ছে বিশেষ এক ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা, যার সাহায্যে কথা বলতে অক্ষম অথবা স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না এমন রোগীদের চিকিৎসা করা হয়। জিহ্বায় আটকানো, তোতলামি, শিশুদের দেরিতে কথা বলা, কানে কম শোনাজনিত কথা বলার সমস্যা ইত্যাদি নানা কারণে যারা স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না, তাদের সাহায্য করে এই স্পিচ থেরাপি।

    কোথায় যোগাযোগ করবেন?

    বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) স্পিচ থেরাপি সেন্টার আছে। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও ভিত্তিক সংস্থা ও এ ধরনের সেবা দিয়ে থাকে।

    সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন।

    ছবি- সংগৃহীত: সাটারস্টক

    আপনার শিশুটি ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সে ভুগছে না তো?

    0

    লেখকঃ হিমিকা আকরাম

    ১২ বছরের শান্ত। ওর মা ওকে নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেছেন আজকাল। ও দুধ বা দুধের তৈরি কিছুই খেয়ে হজম করতে পারছে না। হয় বমি করে ফেলে দিচ্ছে না হয় হজমে সমস্যা না হলে পাতলা পায়খানা। একটা না একটা সমস্যা হচ্ছেই। ডাক্তারের কাছে নেবার পর ডাক্তার সব দেখে শুনে যা বললেন, তাতে তো শান্ত’র মায়ের আক্কেল গুড়ুম! শান্ত’র নাকি ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স আছে! দুধ কিংবা দুধ দিয়ে তৈরি কিছু ওকে দেয়া যাবে না। মায়ের তো মাথায় হাত। এখনতো ওর বাড়ন্ত বয়স। দুধ না খেলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি বা ক্যালসিয়াম কোথা থেকে পাবে? এইরকম সমস্যা অনেক শিশুরই হয়ে থাকে। তবে ভয়ের কিছু নেই। ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স খুব মারাত্মক কোন সমস্যা না। শুধু একটু বুঝে শুনে চললেই হল। চলুন জেনে নিই শিশুর ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সে করণীয় নিয়ে বিস্তারিত।

    ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স কী?

    এটি এমন এক সমস্যা যেখানে আমাদের শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ ল্যাক্টেজ  নামক এনজাইম উৎপাদিত হয় না। এই এনজাইম এর কাজ হল দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার এর মধ্যে থাকা ল্যাকটোজ-কে ভেঙে এটি দুই ধরনের সুগার তৈরি করে-  গ্লুকোজ এবং গ্যালাক্টোজ। মানবদেহ তখন এই সুগার-গুলোকে শোষণ করে আমাদের শরীরে থাকা ইন্টেস্টাইন এর সাথে মিশিয়ে দেয়। যখনি এই ল্যাক্টেজ এনজাইম-এ ঘাটতি দেখা দেয়, এটা আর ঠিকমতো ল্যাকটোজ-কে ভাঙতে বা শোষণ করতে পারে না। তখনি দেখা দেয় ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স। উল্লেখ্য, গ্লুকোজ-এর অনেক উৎস আছে, কিন্তু গ্যালাক্টোজ-এর একমাত্র উৎস হল দুধ। বিশেষত মায়ের দুধ-এ গরুর দুধ বা ফর্মুলার চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ ল্যাকটোজ থাকে।

    ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স আর মিল্ক অ্যালার্জি কি একই?

    না, দুটো এক নয়। অনেক বাবা-মা’ই দুটোকে গুলিয়ে ফেলেন। ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স হল হজমগত সমস্যা। আর মিল্ক অ্যালার্জি রোগ প্রতিরোধ  ক্ষমতায় কোন সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। তাই দুটো এক নয়।

    লক্ষণ যদিও ক্ষেত্র বিশেষে এক হয়ে থাকে কোন কোন সময়ে। যেমন- দুধ বা দুগ্ধজাত কিছু খেলেই  পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া ইত্যাদি। তবে ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স মারাত্মক কোন সমস্যার দিকে ঠেলে দেয় না। পক্ষান্তরে, মিল্ক অ্যালার্জির ঠিক মতো চিকিৎসা না হলে তা ‘অ্যানাফিলেক্টিক শক’ নামে প্রাণঘাতী অসুখের কারণ হতে পারে। তাই যদি দেখেন দুধ বা দুধের তৈরি কোন কিছু খেলেই বাচ্চার ঠোঁট ফুলে গেছে বা র‍্যাশ হয়েছে, চুলকাচ্ছে- তাহলে বুঝতে হবে ওটা মিল্ক অ্যালার্জি

    কোন কোন বাচ্চার আবার দুধ এর স্বাদ বা গন্ধ সহ্য হয় না। ওটাও কিন্তু ল্যাক্টোজ ইন্টলারেন্স না।

    দুধ - shajgoj.com

    আরেকটা বড় পার্থক্য হল, মিল্ক অ্যালার্জি থাকলে সাধারণত তা শিশুর প্রথম বছর থেকেই বোঝা যায়। কিন্তু ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স সাধারণত শিশুদের একদম জন্ম থেকেই হচ্ছে, এমনটা অপেক্ষাকৃত কম দেখা যায়।

    ১) প্রাইমারি ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স

    সাধারণত, একটু বড় হবার পর বা কৈশোরে এই সমস্যা ধরা পড়লে, একে প্রাইমারি ল্যাক্টোজ ইন্টলারেন্স বলে। সাধারণত প্রাইমারি ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স-টাই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যেখানে ল্যাক্টেজ শরীরের সাথে প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা আস্তে আস্তে কমে আসে। প্রাইমারি ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স মূলত দেখা যায় আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকাতে। বয়সের সাথে সাথে আবার প্রাইমারি ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স কমেও আসে, কারণ ততদিনে দুধের উপর নির্ভরশীলতা কমে আসে এবং আর বহুবিধ খাবারে আমাদের শরীর অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

    ২) সেকেন্ডারি ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স

    সেকেন্ডারি ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স-এর বেলায়, অনেক সময়ে কোন ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাল ইনফেকশন, সার্জারি বা দীর্ঘ অসুখের পর শরীরে দুধ সহ্য হয় না। তখন শরীরের ধরন বুঝে একটু পানি মিশিয়ে পাতলা করে দুধ খাওয়ানো যেতে পারে।

    নানা ধরণের ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স - shajgoj.com

    ৩) জন্মগত ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স

    এমনটা খুবই বিরল সমস্যা যে বাচ্চা জন্ম থেকেই দুধ একদম সহ্য করতে পারছে না বা খেলেই যন্ত্রণা পাচ্ছে, ডায়রিয়া হয়ে যাচ্ছে বা বমি করে ফেলছে।  এসব ক্ষেত্রে যা হয়, তার জন্য দায়ী হল জীনগত সমস্যা। বাবা বা মায়ের কাছ থেকে এই সমস্যা বংশগত ধারায় বাচ্চাও পেয়ে থাকে, ফলে শিশুর শরীরে ল্যাক্টেজ হরমোন থাকে পুরোপুরি অনুপস্থিত। মায়ের দুধে অনেক বেশি ল্যাকটোজ থাকে আগেই বলেছি, এমনকি ল্যাকটোজযুক্ত ফর্মুলা  খেলেও বাচ্চা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। এই ধরনের ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স মারাত্মক হয়ে দাঁড়াতে পারে যখন ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা এবং ইলেক্ট্রোলাইট-এর ভারসাম্যহীনতার কারণে  শিশুর জীবন ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে।

    ৪) বিকাশগত ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স

    আরেকটা কারণে ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স হতে পারে, তা হল শিশু যদি প্রিম্যাচিওর হয়। সাধারণত শরীরে ল্যাকটেজ এনজাইমা তৈরি হয় মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় ৩৪ সপ্তাহ বয়স থেকে। সেটা ব্যাহত  হলে পরবর্তীতে এদের মাঝে ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স-এর  প্রবণতা দেখা দেয়।

    লক্ষণ

    • দুধ বা দুধ এর তৈরি কিছু খেলে পেটে ব্যথা হওয়া বা পেট ফুলে যাওয়া।
    • দুধ খাওয়ানোর সময়ে শিশুর ছটফট করা।
    • ওজন বৃদ্ধি না পাওয়া।
    • দুধের শিশু, অথচ দুধ খাওয়ানোর পর-ই ডায়রিয়া
    • গ্যাস হওয়া।
    • বমি এবং পাতলা পায়খানা হওয়া।

    এই সমস্যা নির্ণয় করা যায় কীভাবে?

    এই সমস্যা ধরতে চিকিৎসকেরা নানান ধরনের পরীক্ষা করে থাকেন।  যেমন রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হয় যে উচ্চ ল্যাকটোজ সমৃদ্ধ তরল খাবার খাওয়ার পর শরীরে কেমন প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। আরেকটা হল হাইড্রোজেন ব্রিদ টেস্ট, উচ্চ ল্যাকটোজ সমৃদ্ধ তরল খাবার খাওয়ার পর দেখা হয়ে থাকে যে নিঃশ্বাসের সাথে কতখানি হাইড্রোজেন নিঃসরণ হচ্ছে। যদি ল্যাকটোজ পুরোপুরি হজম না হয়, তবে নিঃশ্বাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রার হাইড্রোজেন পাওয়া যাবে। আবার শিশুদের বেলায় যেটা করা হয়, তা হল স্টুল এসিডিটি টেস্ট, যেখানে শিশুদের মলের স্যাম্পল নিয়ে দেখা হয় তাতে ল্যাকটিক এসিড এর পরিমাণ কতখানি। ল্যাকটিক এসিড তৈরি হয় তখনি, যখন শরীরের ইন্টেস্টাইন গ্রন্থি হজম না হওয়া ল্যাকটোজ সুগার-কে ব্যাকটেরিয়ায় পরিণত করে।

    শিশুর ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সে কি করণীয়?

    ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স শিশুদের একদম জন্ম থেকে হচ্ছে, এমনটা অপেক্ষাকৃত কম দেখা যায়; তবু যদি এর ব্যতিক্রম হয়? যদি অল্প বয়সেই ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স হয়? বাচ্চাকে কি খাওয়াবেন? চিন্তায় পড়ে গেলেন তো? দুধ তো সবচেয়ে ভালো সুষম খাদ্য। ওটাই যদি বাড়ন্ত বয়েসের বাচ্চাকে খাওয়ানো না গেল, তাহলে ওর বিকাশ হবে কি করে?

    ভয়ের কিছু নেই। ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সের সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা হল ডায়েট থেকে দুধ এবং দুধের তৈরি খাবার একদম কমিয়ে দেয়া বা বাদ দিয়ে দেওয়া। কেননা শরীরে ল্যাকটোজ বাড়ানোর কোন ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি এখনো পাওয়া যায়নি। সয়া মিল্ক খেতে পারেন অনায়াসে, শরীরে ল্যাকটোজের ঘাটতি পূরণের জন্য। আর ক্যালসিয়াম এর ঘাটতি পুষিয়ে নিতে ডিম, মাছ, মাংসর পাশাপাশি খেতে হবে পালং শাক, সবজি এবং ফল। সহজ কথায়, বাচ্চার খাবারের টিপস, ট্রিক্স এবং রেসিপি মাথায় রাখুন।

    তা না হলে শরীরে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন –ডি, রিবফ্লাভিন, বা প্রোটিন এর অভাব দেখা দেবে। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে খেতে পারেন ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট। নবজাতক বাচ্চাদের এই সমস্যা থাকলে তাদেরকে দিতে হবে ল্যাকটোজ ফ্রী ফর্মুলা। বড় বড় সুপারস্টোর গুলোতে সহজেই কিনতে পাবেন এটা। বুক এর দুধ একদম না।

    আবার ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সের সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কিন্তু অনেকেই আধা কাপ এর মতো দুধ কোন সমস্যা ছাড়াই খেয়ে হজম করতে পারেন। আর দুধ এর তৈরি কিছু খাবার কিন্তু আছে, যাতে উচ্চমাত্রার ল্যাকটোজ নেই। যেমন পারমিসিয়ান চীজ, চেড্ডার চীজ, অথবা টকদই অল্প করে খেলে সমস্যা নেই।

    কিছু কিছু খাবার এ কিন্তু দুধ থাকে, যা না জেনেই আমরা সেগুলো খেয়ে থাকি, যেমন ইনস্ট্যান্ট সুপ, সালাদ ড্রেসিং, সস, সিরিয়েল, বেকিং মিক্স ইত্যাদি। তাই এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।

    ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স প্রতিরোধ যোগ্য সমস্যা না। আবার সবসময়ে এটা চিরস্থায়ীও হয়, এমন নাও হতে পারে। তবে এটা কারও মাঝে যে মাত্রাতেই থাকুক না কেন, খাদ্যগ্রহণে একটু সচেতন হলেই পুরোপুরি সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে আপনার আদরের সোনামণিকে বড় করে তোলা সম্ভব।

    আপনার সন্তানটি নিরাপদে বেড়ে উঠছে তো?

    0

    লেখকঃ ফারজানা হক অনি

    আমরা সবাই কমবেশি আমাদের বাচ্চাদের অপরিচিত মানুষদের থেকে কীভাবে নিজেদের নিরাপদ রাখতে হয় এই শিক্ষা দেই। কিন্তু বিপদ কি সবসময় অপরিচিতদের দ্বারা হয়? পরিস্যংখান বলে শতকরা ৭৫% শিশুই তার পরিচিত বা আত্মীয়দের দ্বারা নিপীড়িত হয়। চলুন জেনে নেই কিছু তথ্য যা জেনে রাখলে বুঝবেন আপনার সন্তানটি নিরাপদে বেড়ে উঠছে কিনা।

    কী করে বুঝবেন আপনার সন্তানটি নিরাপদে বেড়ে উঠছে? 

    (১) একটা ব্যাপার অবশ্যই খেয়াল রাখবেন, নির্যাতনকারীর কাছে শিশুটি ছেলে নাকি মেয়ে তা ব্যাপার নয়। নিপীড়নকারী হল কিছু বিকৃত রুচির লোক যারা ছোটদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ইংরেজিতে এদের বলে পেডোফাইল (Pedophile), এবং এই বিকৃতিকে বলে পেডোফিলিয়া। নিপীড়িত শিশুদের মধ্যে ২৫%-ই ছেলে। সুতরাং নিচের সব রুলস শুধু মেয়েদের বেলায় প্রযোজ্য আর আপনার ছেলে শিশুটি সেইফ, এমন কখনোই ভাবতে যাবেন না। আত্মরক্ষার কৌশল জানা ছেলে-মেয়ে, ছোট-বড় সবারই জানা জরুরি।

    (২) প্রথমেই শিশুকে শিখান বাবা-মা, ভাইবোন ছাড়া অন্য যে কারো কাছ থেকে কতটুকু দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। শিশুকে তার ব্যক্তিগত শারীরিক সীমা সম্পর্কে শিক্ষা দিন। তার শরীরের সেইফজোন আর আন-সেইফজোন সম্পর্কে ধারণা দিন। তাকে বোঝান যে ঠিক কতটুকু কাছে সে কাউকে আসতে দেবে আর কতটুকু কাছে আসলে আপত্তি প্রকাশ করতে হবে।

    (৩) মনে রাখবেন, বেশিরভাগ সময় শিশু আপনারই কোন আত্মীয় অথবা পরিচিত মানুষ যাকে আপনি বিশ্বাস করেন, তার দ্বারা নিপীড়িত হয়। তাই আপন পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কারো কাছে শিশুকে দিবেন না। কেউ আপনার শিশুর প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দিচ্ছে কিনা লক্ষ্য রাখুন; বেশি করে আদর করা অথবা শিশুকে খুশি করার জন্য তার প্রিয় উপহার অথবা চকলেট দিয়ে তাকে কোলে নেয়ার চেষ্টা করছে কিনা খেয়াল রাখুন। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সবার আগে আপনাকেই মনযোগী ও সাবধান হতে হবে।

    (৪) কোন আত্মীয় বা পরিচিত কারো সাথে কখনোই শিশুকে একা কোথাও যেতে দিবেন না। তাকে কারো কাছে রেখে কোথাও যাবেন না। বাসায় একা রেখে না যাওয়ার চেষ্টা করবেন, আর গেলেও তাকে শিখিয়ে দেবেন বাবা-মা ছাড়া আর কেউ আসলে কোন অবস্থাতেই যেন দরজা না খুলে। কেননা, এসব ঘটনা বেশিরভাগ সময় আপনি যাদের বিশ্বাস করছেন তাদের দ্বারাই হয়ে থাকে।

    (৫) আপনার শিশুর আচরণের দিকেও মনোযোগ দিন। কোন আত্মীয়র প্রতি শিশুর বিরূপ মনোভাব দেখলে সাবধান হয়ে যান এবং এর কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। হয়ত তার কাছে যেতে আপনার শিশুটি অস্বস্তিবোধ করছে, কিংবা তাকে দেখে ভয় পাচ্ছে অথবা কাঁদছে; এমন ক্ষেত্রে কখনই তাকে জোর করবেন না বরং সুন্দরভাবে কথা বলে কারণ জানার চেষ্টা করুন।

    (৬) শিশুকে শিক্ষা দিন কীভাবে এবং কোথায় স্পর্শ করা অগ্রহণযোগ্য। অপরিচিত হোক বা খুব কাছের কেউ, কোন অবস্থাতেই যেন কেউ অস্বস্তিকরভাবে তাকে টাচ না করে এবং এমন কিছু হলে যেন আপনাকে জানায়।

    (৭) স্কুল থেকে আনা নেওয়া করার জন্য যত বছরের পুরনো ড্রাইভারই হোক, তাদের দায়িত্ব দেবেন না কিংবা জরুরী প্রয়োজনে দিলেও বাসায় আসার পর শিশুর কাছ থেকে পরোক্ষভাবে জেনে নিশ্চিন্ত হয়ে নিন।

    (৮) শিশু যদি কারো ব্যাপারে আপনার কাছে শেয়ার করে, তাকে সাহস আর আশ্বাস দিন। আপনার অনেক কাছের কারোর ব্যাপারে হলেও শিশুকে অবিশ্বাস করবেন না, তাকে লোকলজ্জার ভয়ে চুপ থাকতে বলবেন না বরং অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিন। চুপ থাকা কোন সমাধান না, ছোটবেলার খুব ছোট ছোট বাজে অভিজ্ঞতার স্মৃতি সারাজীবন তাদের ট্রমা হিসেবে বয়ে বেরাতে হয়।

    (৯) আপনার ছেলে-মেয়ে যদি অ্যাবিউজড হয়, তাহলে তাকে দোষারোপ করতে যাবেন না। মনে রাখবেন, মানসিক বিকারগ্রস্ত লোকের কাছে নির্যাতন করার জন্য কোন কারণ বা লজিক লাগে না। ভিকটিম ব্লেমিং না করে অপরাধীর বিরুদ্ধে অবস্থান করুন। বাংলাদেশে এখন চিলড্রেন এন্ড উইমেন অ্যাবিউজ (নারী ও শিশু নির্যাতন) আইন বেশ কঠোর। তাই, উপযুক্ত আইনের আশ্রয় নিন।

    বিপদের মুখোমুখি হলে কী করবে?

    (১) বাবা-মার নাম করে স্কুল থেকে কিডন্যাপাররা শিশুদের নিয়ে যেতে পারে এমন ভয় মোটামুটি সব শিশুকেই দেখানো হয়। কিন্তু সত্যি সত্যি এমন পরিস্থিতিতে পরলে কি করতে হবে তা শেখানো হয় না। ১টা কোড ওয়ার্ড ঠিক করুন। এমন ১টা শব্দ যা শুধু শিশু এবং তার মা-বাবা জানবে। খুব অদ্ভুত কোন শব্দ না আবার একদম সাধারণ কোন লাইন ও যেন না হয়। আপনি স্কুলে অন্য কাউকে পাঠালে শিশুকে বলুন নিশ্চিত হয়ে নিতে ঐ শব্দ ব্যবহার করে যে গিয়েছে তাকে আপনিই পাঠিয়েছেন কিনা। কিন্তু পারতপক্ষে এরকম কাউকে না পাঠানোই বেটার যাকে আপনার শিশু ভালোভাবে চিনে না।

    (২) শিশুকে অপরিচিত কারো হাত থেকে খাবার নিতে নিষেধ করবেন। এমন কি রাস্তা থেকে খাবার কিনে খাওয়ার ব্যাপারেও সাবধান করুন। কিছুদিন আগে ভারতে এমন নিউজ হয়েছিল যেখানে দেখায় কীভাবে কিডন্যাপারদের একটি চক্র রাস্তার ঝালমুড়ি, ফুচকাওয়ালাদের সাথে মিলে খাবারে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে দেয়।

    (৩) আপনার মেয়েটি রাস্তায় একা চলার পথে তাকে যদি কেউ ফলো করে তাহলে তাকে বলুন যেন যতোটা সম্ভব জোরে চিৎকার করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। আর যদি কোন গাড়ি পিছনে আসতে থাকে তাহলে যেন সে গাড়ির উলটো দিকে দৌড়াতে শুরু করে, তাহলে গাড়ি ঘুরিয়ে আসার ফাঁকে সে অনেকটা দূর যেতে পারবে।

    (৪) হঠাৎ যদি কোন গাড়ি পাশে এসে থামিয়ে তাকে ভিতরে নেয়ার চেষ্টা করে, তাহলে যতোটা সম্ভব জোরে হাত-পা ছুঁড়তে হবে, কোনভাবেই যেন গাড়ির ভিতরে ঢুকাতে না পারে।

    (৫) একটু বয়স হলেই আপনার ছেলে এবং মেয়েকে বেসিক আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দিন। এখন শহরের বিভিন্ন জায়গায় মার্শাল আর্ট, কারাতে, জুডো, তায়কোয়ান্দ, ক্রাভ-মাগা ইত্যাদি শেখানোর একডেমি আছে। এগুলো শিখে রাখা ছেলে-মেয়ে সবার জন্যই সমান ইম্পরট্যান্ট। যেকোনো ইমারজেন্সি সিচুয়েশনে নিজেকে বাঁচাতে কী কী করতে হবে তা জানা থাকলে আপনি অনেকটাই নিশ্চিন্তে তাদের বের হতে দিতে পারবেন।

    আপনার সন্তানটি নিরাপদে বেড়ে উঠছে কিনা তা এখন আশা করি বুঝতে পেরেছেন। আপনার সন্তানটি নিরাপদে বেড়ে এই কামনা রইলো, ভালো থাকবেন।

    শিশুর জন্মগত হৃদ্‌রোগে করণীয়

    0

    লেখকঃ ডা. তাহমিনা করিম

    সুস্থ শিশুর জন্ম সবার কাম্য। কিন্তু সব শিশু পরিপূর্ণ সুস্থভাবে পৃথিবীতে আসে না। কোনো কোনো শিশু সঙ্গে করে নিয়ে আসে হৃৎপিণ্ডে ছিদ্র, রক্তনালি বা রক্তনালির ভাল্‌ভ সরু থাকার মতো সমস্যা।

    নানা কারণেই শিশুর জন্মগত হৃদ্‌রোগ হতে পারে। মায়ের গর্ভে থাকার সময় শিশুর হৃদ্‌যন্ত্রের পরিপূর্ণ গঠন ও বিকাশ না হলে অথবা কোনো ত্রুটি নিয়ে জন্মালে শিশুর এসব হৃদ্‌রোগ দেখা দেয়।

    সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় অথবা গর্ভ-পরিকল্পনার সময় যদি মা রুবেলা ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তাহলে শিশুর হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অন্তঃসত্ত্বা নারী নানা রকম ওষুধ খেলেও এমন হতে পারে। শিশুর হৃৎপিণ্ডের গঠনগত ত্রুটি বা বংশগত কারণেও শিশুর হৃদ্‌রোগ হতে পারে।

    উপসর্গ

    • জন্মের পরপরই শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়া।
    • ঠোঁট, জিহ্বা ও হাত-পায়ের আঙুল নীলাভ হয়ে আসা।
    • জন্মের পর থেকেই বারবার ঠান্ডা-কাশি লাগা।
    • মায়ের বুকের দুধ টেনে খেতে অসুবিধা হওয়া।
    • দুধ খাওয়ার সময় মুখ ও শরীর ঘেমে যাওয়া।
    • শিশুর বুকে ব্যথা।
    • শিশুর হৃৎস্পন্দনের গতি অস্বাভাবিক হওয়া।

    চিকিৎসা

    শিশুর হৃদ্‌রোগ দুই ধরনের হতে পারে। কোনো শিশু হৃদ্‌রোগ নিয়েই জন্মায়, আবার কারও কারও ক্ষেত্রে জন্মের পর হৃদ্‌রোগ দেখা দেয়। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা শুরু করলে বেশির ভাগ হৃদ্‌রোগ ভালো হয়।

    শিশুর হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা দুভাবে করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ও বিনা অস্ত্রোপচারে। হৃদ্‌রোগ নির্ণয়ের পর ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু করা হয়। অবস্থা বুঝে পরে ধাপে ধাপে অস্ত্রোপচার লাগতে পারে।

    প্রতিরোধ

    • গর্ভকালীন প্রথম তিন মাস খুব সাবধানে পার করতে হবে। এ সময়টা গর্ভবতী নারীর জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। এ সময় সন্তান ধারণ করলে সন্তানের নানা ত্রুটি হতে পারে বা হৃদ্‌রোগ নিয়ে জন্মাতে পারে। এ ছাড়া মায়ের জন্মগত হৃদ্‌রোগ থাকলে শিশু হৃদ্‌রোগ নিয়ে জন্মাতে পারে।
    • এ সময় কোলাহলপূর্ণ জায়গা ও সামাজিক মেলামেশা যত সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে।
    • গর্ভকালীন যেকোনো ধরনের তেজস্ক্রিয়তা থেকে দূরে থাকতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে এক্স-রে করতে হলে গর্ভের শিশুকে এক্স-রে রশ্মি থেকে বাঁচাতে লেড অ্যাপ্রোন পরা যেতে পারে।
    • ধূমপান বা মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে অবশ্যই বাদ দিতে হবে।
    • গর্ভবতী হওয়ার তিন মাস আগে এমএমআর টিকা নেওয়া ও গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
    • lএ সময় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ওষুধ খাওয়া যাবে না।

    ডা. তাহমিনা করিম, পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল

    তথ্যসূত্র: দৈনিক প্রথম আলো

    জীবনচক্রের অমোঘ সত্য।

    0

    একটা বাচ্চার বড় হতে থাকার প্রক্রিয়াটা বিস্ময়ের। তার চাহনি, মুখভঙ্গি, হাসি, জড়িয়ে ধরা, আঁকড়ে থাকা- খুব অদ্ভূত। জীবনের দিকে তাড়িত করার জন্য, পৃথিবীকে উপলদ্ধি করার জন্য যেসব মৌলিক অনুভূতির আছে, তার অন্যতম হলো সন্তানের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতাকে প্রত্যক্ষ করা। গহীন বড় হচ্ছে, এই অভিজ্ঞতা আমাকে পৃথিবীর দিকে ফেরাতে সাহায্য করেছে প্রবলভাবে। এখন দেখি সে তার ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে ছবি ওঠাচ্ছে; আমি বা তার মা সঙ্গে নাই- এটাও আশ্চর্যের। এভাবে অনেক অনেক আশ্চর্য উপহার দিয়ে একটা শিশু বড় হবে। আর প্রবাহিত হতে থাকবে জীবনচক্রের অমোঘ সত্য। গহীন আরো বড় হয়ে উঠুক। সে আগামী বছর ক্লাস ওয়ানে উঠে যাবে। এটাও কিন্তু বিস্ময়ের-ই!

    -ফারুক আহমেদ

    নোটিশঃ প্রিয় অভিভাবক, আপনিও চাইলে আপনার সন্তানকে নিয়ে লিখতে পারেন। আপনার লেখা এবং ছবি পাঠিয়ে দিন আমাদের ইমেইলে। [email protected] আমরা আপনার লেখা ও ছবি আগ্রহ সহকারে প্রকাশ করতে চাই।

    ঘরে আপনার শিশু নিরাপদ তো?

    0
    Child abuse. Father yelling at his daughter. Shadow of man on wall

    -জিনাত শারমিন

    ধরে নেওয়া যাক, তার নাম লিপি। খুব ছোটবেলায় তার বাবা মারা যায়। তখন থেকে লিপিদের বাসায় থাকত তার ছোট চাচা। তিনি লিপিকে নিয়মিত পর্নো ভিডিও দেখাতেন। লিপিকে দিয়ে নিজের যৌনাঙ্গ স্পর্শ করাত। কোনো দিন মাকে এ কথা বলতে পারেননি লিপি । লিপি এখন সব যৌন সম্পর্ককে ঘৃণা করেন। সিনেমায় যৌনদৃশ্য এলেও লিপি উঠে চলে যান। সেখান থেকে জীবনে আর বিয়েই না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন লিপি।

    বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিকতম সমীক্ষা বলছে, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে শিশু ও তার বাবা–মা যৌন নির্যাতককে চেনে। নিজের ঘরেই শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয় সবচেয়ে বেশি। নিজের ঘর বা আত্মীয়রাই যদি শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারে, সে ক্ষেত্রে অভিভাবকের কী করণীয়? এ প্রশ্নের উত্তরে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা বলেন, ‘আমরা ১৯৯৪ সাল থেকে একটা কথাই বলে আসছি, শিশু ও শিশুর অভিভাবকদের নীরবতার বলয় ভাঙতে হবে। ঘরে থাকা কোনো আত্মীয়, ভাই, দেবর—যে কেউ হতে পারে শিশুর যৌন নির্যাতক। ডাইনিং টেবিলে সবাই যখন একসঙ্গে খায়, তখন বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলাপ হতে পারে। তাতে সম্ভাব্য যৌন নির্যাতক সতর্ক হয়ে যাবে। এ রকম কিছু করার সাহস পাবে না। একটা শিশুও সব মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার নিয়ে জন্মায়। তাই শিশুকে কেবল স্নেহ নয়, সম্মানও করতে হবে। “চাইল্ড এমপাওয়ারমেন্টের” (শিশুর ক্ষমতায়ন) ওপর জোর দিতে হবে।’

    এই উন্নয়নকর্মী আরও জানান, শিশুকে যেভাবে বোঝানো হয়, শিশু সেভাবেই বোঝে। সাধারণত, যৌন নির্যাতক শিশুকে বিষয়টিকে ‘খেলা’ হিসেবে উপস্থাপন করে। তাই শৈশবে শিশুর এমন স্পর্শ ভালোও লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে শিশুকে ‘উইন্ডো মেথড’ পদ্ধতিতে একটা একটা করে ঘরের জানালা খোলার মতো করে একটু একটু করে তার যৌনাঙ্গ, সম্ভাব্য যৌন হয়রানি নিয়ে জানাতে হবে। শিশুর সঙ্গে যদি এমন কিছু ঘটে, সে যেন সঙ্গে সঙ্গে নির্ভরযোগ্য কেউ যেমন বাবা, মা, স্কুলের শিক্ষকদের জানায়। যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে পরিবারকে মুখ খুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভিকটিমের কোনো দায় নেই। সব লজ্জা, অপমান কেবল নির্যাতনকারীর।

    অনেকেই বলেন, বলিউড তারকা আলিয়া ভাটের সেরা সিনেমা ২০১৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত, ইমতিয়াজ আলী পরিচালিত হাইওয়ে। এই সিনেমায় আলিয়া ভাটের চরিত্রের নাম ভিরা ত্রিপাঠি। ছোটবেলায় তার চাচার মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় এই ভিরা। পরে অপহরণের শিকার হয়ে ফিরে এসে সে তার পরিবারের সামনে সেই চাচাকে চিৎকার করে তার কর্মকাণ্ডের কথা জানায়। ছোটবেলা থেকে বয়ে বেড়ানো ট্রমা থেকে মুক্ত হয়। এই সিনেমা মুক্তির পর ভারতের বহু নারী ও পুরুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের ছোটবেলায় আত্মীয়–পরিচিতদের মাধ্যমে হওয়া যৌন হয়রানির কথা প্রকাশ্যে আনেন। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস নন্দিত নরকের একটি চরিত্র রাবেয়া। নিম্নবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে রাবেয়া বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। সে বাসার ‘লজিং মাস্টার’, তার বাবার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুর মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার হয়। গর্ভপাত করাতে গিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যায়। এ তো গেল উপন্যাসের কথা। সমীক্ষা জানাচ্ছে, বিশেষ শিশুদের যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। আর একবার যিনি ছোটবেলায় যৌন হয়রানির শিকার হন, বারবার তার সঙ্গে এ ঘটনা ঘটতেই থাকে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হেলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, হয়রানির শিকার শিশুরা পরবর্তী জীবনে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভোগেন। কেউ কেউ যৌন নিপীড়কও হয়ে ওঠে।

    কেবল মেয়েশিশুই যে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তা–ই নয়; আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে পুরুষ শিশুর যৌন নির্যাতনের ঘটনা। আবার যৌন নির্যাতক মানেই যে পুরুষ, তা–ও নয়; নারীও হতে পারেন যৌন নির্যাতক। এমন একাধিক রেকর্ড আছে ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের কাছে। নিজের একটা অভিজ্ঞতা ভাগ করলেন পেশাদার কাউন্সিলর ফারজানা রশিদ চৌধুরী। তাঁর বয়ানেই শুনতে পাই:

    ‘ছোট ছেলেকে নিয়ে আমার কাছে একদিন একজন মা এলেন। সিঙ্গেল মাদার। সে নাকি স্কুলে যেতে চায় না। পড়াশোনায় কোনো মন নেই। বন্ধুদের সঙ্গেও কথা বলে না। কিন্তু আগে খুব অ্যাটেন্টিভ ছিল। সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। বাচ্চার সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চাইলাম। মা একটু অসন্তুষ্ট হলেন। এ কথা, সে কথার পর বাচ্চা জানাল, মা অফিসে চলে গেলে মামা তাকে নানাভাবে যৌন নির্যাতন করে। এ কথা জানানোমাত্র রেগে গেলেন মা। ছেলেকে নিয়ে উঠে চলে গেলেন। আর কখনো আমার চেম্বারে আসবেন না, এও বলে গেলেন। কিছুদিন পর ছেলেকে নিয়ে আবার এলেন ওই মা। সন্দেহ হওয়ায় ভাইকে না জানিয়ে বাসায় সিসি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন তিনি। নিজে চোখে দেখেছেন ভাইয়ের কাণ্ড। আমি ফ্যামিলি কাউন্সেলিং করাই। মা তাঁর ভাইকে বাসা থেকে বের করে দেন। ধীরে ধীরে কাউন্সেলিং সেবা নিয়ে ছেলেটি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছিল।’

    অভিভাবক ও পরিবারের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে কীভাবে শিশুকে নিরাপদ রাখা যায়। এরপরও যদি যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটে, তাহলে সবার আগে নীরবতা ভাঙুন। নির্যাতককে বাড়ি থেকে বের করুন। শিশুকে সাহস দিন। জানান যে আপনি তার পাশে আছেন। আইনি সহায়তা নিতে ৯৯৯–এ ফোন করতে পারেন। স্থানীয় পুলিশকেও জানাতে পারেন। শিশুকে প্রয়োজনে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করান। কমিউনিটি ক্লিনিকেও নিতে পারেন। শিশুকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে পেশাদার কাউন্সেলিং। প্রাথমিক সবকিছু সেরে শিশুকে নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে আসতে পারেন। যাতে সহজেই সে ট্রমা থেকে বের হয়ে আবার ফেলে আসা জীবনে ফিরতে পারে।