More
    Home Blog

    শহুরে কিশোর-কিশোরী মানসিক চাপে ভুগছে

    0
    Sad unhappy teenage girl

    বাংলাদেশের ১৩-১৯ বছর বয়সী শহুরে ছেলেমেয়েদের ৬০ শতাংশের বেশি মাঝারি থেকে তীব্র মানসিক চাপে ভোগে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে।

    এই স্ট্রেস বা মানসিক চাপের ফলে তাদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়। যেমন, নাগরিক এই কিশোর-কিশোরীদের একটি বড় অংশ স্থূলতা এবং বিষণ্ণতা বা অবসাদে ভোগে।

    এছাড়া শহুরে ছেলেমেয়েদের মধ্যে শারীরিকভাবে সক্রিয় মানে নিয়মিত খেলাধুলা এবং কায়িক পরিশ্রমের কাজ করে মাত্র আড়াই শতাংশের কিছু বেশি কিশোর-কিশোরী।

    বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশন, পাবলিক হেলথ ইন্সটিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি সংস্থার করা যৌথ এই গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তানদের এ ধরণের মানসিক চাপের ব্যাপারে পরিবারে বা অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা খুবই কম।

    ফলে মানসিক চাপ সামলাতে পরিবার এবং স্কুলের সহায়তাও খুবই কম পায় তারা।

    কী নিয়ে মানসিক চাপে থাকে কিশোর-কিশোরীরা?

    গবেষণার একজন সহ-গবেষক আমব্রিনা ফেরদৌস বিবিসিকে বলেছেন, জরিপটি মহামারি শুরুর আগে ২০১৯ সালে ঢাকাসহ দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে পরিচালনা করা হয়েছে।

    বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল বিএমআরসি গবেষণা নিবন্ধটি অনুমোদন দিয়েছে।

    গবেষণাটি ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী সাড়ে চার হাজারের বেশি কিশোর-কিশোরীর সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে পরিচালনা করা হয়েছে।

    বয়ঃসন্ধিকালে সারা পৃথিবীতেই ছেলেমেয়েরা নানা রকম মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। আর হরমোনের নানা পরিবর্তনের সাথে সাথে যুক্ত হয় পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ।

    ভালো স্কুলে শিক্ষার সুযোগ পাওয়া, ভালো ফলসহ শিক্ষা কার্যক্রমে সাফল্য এমনতর নানাবিধ চাপ তৈরি হয় ছেলেমেয়েদের ওপর।

    মিজ ফেরদৌস বলছেন, গবেষণায় দেখা গেছে ছেলেমেয়েরা সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপ বোধ করে পড়াশোনা নিয়ে।

    এছাড়া ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, স্কুলের পারফরম্যান্স এবং রোমান্টিক সম্পর্কের কারণেও মানসিক চাপে পড়ে তারা।

    “পরীক্ষার রেজাল্ট, বাবা-মায়েদের প্রত্যাশা এবং স্কুলে পড়াশোনার চাপ থেকে তারা সবচেয়ে বেশি স্ট্রেস ফিল করে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোথায় পড়তে যাবে, কী করবে এ সব নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে এই বয়সী ছেলেমেয়েরা।”

    আবার নিজেদের শারীরিক অবয়ব মানে তাদের কেমন দেখাচ্ছে, তা নিয়েও এ বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা বিরাট স্ট্রেস তৈরি হয়।

    “এর একটা কারণ হচ্ছে, শহুরে ছেলেমেয়েদের খাদ্যাভ্যাসে জাঙ্কফুড খাওয়ার প্রবণতা বেশি। আর খেলাধুলার সুযোগও কম, ফলে তাদের মধ্যে ওবেসিটির (স্থূলতা) সমস্যা প্রকটভাবে রয়েছে। ফলে এ নিয়েও ছেলেমেয়েরা মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে,” বলছেন মিজ ফেরদৌস।

    কারণ কী এই মানসিক চাপের?

    সহ-গবেষক মিজ ফেরদৌস বলেছেন, তারা দেখতে পেয়েছেন কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েদের মঙ্গে মা-বাবার মানসিক দূরত্ব, নাগরিক জীবনে একক পরিবার কাঠামোর কারণে একাকীত্ব, স্কুলে বা অবসর সময়ে সমবয়সীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, বুলিয়িং – এসব কারণে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়।

    মানসিক চাপের কারণে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। প্রায়শই তারা নিজেদের সমস্যার কথা তারা পরিবারের সাথে শেয়ার করতে পারে না।

    সমস্যা কথা শেয়ার করা, কিংবা কোন সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে বন্ধু বা সমবয়সীদের ওপর নির্ভর করে।

    বাড়তি ওজন কমানোর জন্য শারীরিক পরিশ্রমের কাজ কিংবা বিশেষজ্ঞ পরামর্শের বদলে খাওয়া কমিয়ে দেয়, যা পরে তাদের শরীরে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি করে।

    কতটা ব্যাপক এই সমস্যা?

    গবেষণায় পাওয়া তথ্য বলছে, ২৬ শতাংশের বেশি শহুরে কিশোর-কিশোরীর ওজন স্বাভাবিকের চাইতে বেশি। এছাড়া ৩০ শতাংশের বেশি ছেলেমেয়ে দিনের বড় সময়টি বাড়ির ভেতরেই থাকে।

    এছাড়া ঘরের বাইরে খেলাধুলা এবং কায়িক পরিশ্রমের কাজ করে মাত্র ২.৬ শতাংশ কিশোর-কিশোরী।

    শহর এলাকায় খোলা জায়গার অভাব এবং ইনডোর গেমের প্রতি আকর্ষণের কারণে ওবেসিটির সমস্যা দিন দিন বাড়ছে।

    মিজ ফেরদৌস বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বাড়ছে, কিন্তু নানা ধরণের বিষণ্ণতা এবং অবসাদ কিংবা আত্মহত্যার মত ঘটনাও বাড়ছে।

    বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে এক ধরণের সামাজিক ট্যাবু কাজ করে, বেশির ভাগ মা-বাবা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চান না।

    আর মা-বাবাদের এই কথা না বলা, বা বিষয়টি এড়িয়ে যাবার কারণে ছেলেমেয়েদের জীবনে ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসতে পারে।

    অনেকেই না বুঝে কুসংসর্গে পড়ে বিপথগামী হয়, কেউ মাদকাসক্তিসহ নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, কেউবা আবার আত্মহণনের পথও বেছে নেয়।

    তিনি বলছেন, “বয়ঃসন্ধিকালে তাদের সাহায্য দরকার। তারা যে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে তা নিয়ে সচেতনতার কথা বলা হলেও এ নিয়ে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। পরিবার এবং স্কুলগুলোর ভূমিকা এখানে আরো অনেক জোরালো হওয়া দরকার।”

    সমস্যা চিহ্নিত করে, একে এড়িয়ে না গিয়ে সমাধানের দিকে নজর দেবার পরামর্শ দেয়া হয়েছে গবেষণায়।

    কিশোরীরা খুব বেশি সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হয়

    0

    বাংলাদেশে তিন কোটি ২০ লাখের বেশি কিশোর-কিশোরী রয়েছে। তরুণ জনমিতির এই দেশে তারাই মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ।

    বেড়ে ওঠার সময়ে কিশোর-কিশোরীরা বাড়তি দায়িত্ব নেয়, নতুন কিছু করতে চায় এবং স্বাধীনতা চায়।

    এটা সেই সময় যখন মানুষের মূল্যবোধ ও দক্ষতা তৈরি হয়, যার বিরাট প্রভাব থাকে নিজের ও সমাজের কল্যাণে। কিন্তু বাংলাদেশে এই বয়সী ছেলে-মেয়েদের সম্ভাবনা অবিকশিতই রয়ে যায়।

    বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সাধারণত কিশোর-কিশোরীদের মতামত প্রদান, কোনো কিছু নিয়ে সোচ্চার হওয়া বা বড়দের প্রশ্ন করতে নিরুৎসাহিত করে।

    সে কারণে তাদের প্রয়োজন ও সমস্যার বিষয়গুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নজর দেওয়া হয় না। এদেশে কিশোর-কিশোরীদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবাগুলো সম্পর্কেও মানুষ ভালোভাবে জানছে না।

    এই তরুণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে তাদের কম বেতনের কাজের চক্রে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

    এদেশের কিশোরীরা গর্ভধারণের হার অনেক বেশী কিন্তু স্বাস্থ্য সেবায় তাদের সেভাবে প্রবেশাধিকার না থাকায় প্রজনন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে খুব জ্ঞান থাকে না।

    প্রচণ্ড পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কুপ্রথার কারণে কিশোরীরা খুব বেশি সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হয়। অন্ত্যজ শ্রেণি, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং প্রতিবন্ধীরা আরও বেশি বৈষম্যের শিকার হয়। দ্রুত নগরায়নের ফলে শহর এলাকা ও বস্তির কিশোর-কিশোরীদের জন্য মৌলিক সেবাও সংকুচিত হয়েছে।

    জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ ভীষণভাবে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোপ্রবণ। এ রকম পরিস্থিতিতে শিশু শ্রম, পাচার ও বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। সংকট ও দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে ধর্ষণসহ অন্যান্য হয়রানির ঝুঁকি বাড়ে তাদের।

    পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন জাতিসত্তার প্রতিনিধিত্বকারী কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ অধিকাংশ এলাকাতেই সংবাদমাধ্যমের আলো পৌঁছেনি।

    বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলে ও মেয়েদের ক্ষেত্রে একই ধরনের সফলতা অর্জনের নজির তেমন একটা নেই।

    যথাযথ পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক না হওয়া, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্যের ঘাটতি এবং তরুণ ছেলে-মেয়েদের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে তাদের তেমন অংশগ্রহণ না থাকার কারণে এমনটা ঘটছে।

    সমাধান

    অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যত্নশীল প্রাপ্তবয়স্করা যখন কিশোর-কিশোরীদের সহায়তা ও উৎসাহ দিয়েছে এবং তাদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে নীতি নির্ধারণ ও সেবা দেওয়া হয়েছে, সেক্ষেত্রে তারা দীর্ঘকালীন দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সহিংসতার চক্র ভেঙে ফেলার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

    অংশগ্রহণমূলক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তরুণ ছেলে-মেয়েদের তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো তুলে ধরনে উৎসাহ দেয় ইউনিসেফ। প্রয়োজনীয় সেবা দাবি করা ও তার সদ্ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এড়িয়ে যেতে শেখানো হয় তাদের।

    কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তি এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের অংশগ্রহণ, বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিতে কাজ করে ইউনিসেফ।

    তরুণদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের নিরাপত্তা ও বিকশিত হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী সামাজিক আচরণের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতেও কাজ করে এই সংস্থা।

    কিশোর-কিশোরী, তাদের পরিবার ও কমিউনিটির সঙ্গে দুই ধাপে সম্পৃক্ত হয় ইউনিসেফ।

    বেতারের শ্রোতাদের মাধ্যমে গ্রামীণ তরুণ-তরুণীদের কাছে পৌঁছায় ইউনিসেফ।সে কারণে কমিউনিটি রেডিওর বিস্তারে কাজ করা হচ্ছে।

    প্রত্যন্ত অঞ্চল, জাতিগত সংখ্যালঘু এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য উপযুক্ত ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক মানসম্মত কনটেন্ট উপহার দিতে কাজ করে ইউনিসেফ।

    প্রচারমাধ্যমের নাগালের বাইরে থাকা এলাকায় তথ্য পৌঁছাতে কমিউনিটি, স্থানীয় ও পল্লীকেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্ম জোরদারে ইউনিসেফ বিনিয়োগ করে।

    ২০১২ সাল থেকে ইউনিসেফ তরুণদের তিনশর বেশি ক্লাবকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে, যেগুলোর সদস্য অন্তত এক লাখ ছেলে-মেয়ে।

    জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়াতে তাদের জীবনাভিজ্ঞতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মেয়েদের বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, সমঝোতা ও সিদ্ধান্তগ্রহণের সক্ষমতা তৈরিতে বিশেষ নজর দেওয়া হয়।

    অল্পবয়সীরা নিজেদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে জীবনমুখী দক্ষতা আয়ত্ত্ব করে নেয়। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা তৈরিতে তাদের গ্রুপ লিডারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে করে সামাজিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলী গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে।

    পরিবার, সমাজ, স্থানীয় সরকার ও ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত কমিউনিটিভিত্তিক শিশু সুরক্ষা কমিটিকে সহায়তা দেয় ইউনিসেফ। এতে বাল্যবিয়ে বন্ধের জনমত তৈরি হয়।

    এসব কমিটিতে ক্লাব সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত দুজন কিশোর-কিশোরীও প্রতিনিধিত্ব করেন।

    কিশোর-কিশোরীবান্ধব নীতিমালা ও কর্মসূচি প্রণয়নে ইউনিসেফ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, তরুণদের বিভিন্ন গ্রুপ, বেসরকারি খাত, জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রচারমাধ্যম এবং জাতিসংঘের অপরাপর সংস্থার সঙ্গে কাজ করে।

    তাদের অধিকার ও বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ এবং তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ ও সামাজিক প্রথার পরিবর্তনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমকে কাজে লাগানো হয়।

    বয়স উপযোগী, সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল এবং শিশুদের বিনোদন ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান তৈরিতে সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের স্থানীয় মিডিয়ার নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করে ইউনিসেফ।

    জলাবয়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধিতে বেতারের শ্রোতা গ্রুপ, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ ও কমিউনিটি মিডিয়া, যেমন: ফোন-ইন শো ও কুইজ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কিশোর-কিশোরীদের সম্পৃক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে হয়রানি, সহিংসতা ও অবহেলার বিষয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য তাদের সক্ষমতা তৈরিতে সহায়তা করা হয়।

    কিশোর-কিশোরী ক্লাব

    0

    সারা দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে চার হাজার ৮৮৫টি কিশোর-কিশোরী ক্লাবের মাধ্যমে সৃজনশীল ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে কিশোর-কিশোরীরা। কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক জয়ন্ত কুমার সিকদার এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সারা দেশেই কিশোর-কিশোরী ক্লাবের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যে কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই পরিবর্তনের ধারক বা চেঞ্জ এজেন্ট হিসেবে কিশোর-কিশোরী ও নারীদের প্রতি সহিংস আচরণের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে সমাজ থেকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরে এবং তৃণমূলে জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্স প্রতিরোধে সক্ষম করে তোলা, সেক্সুয়াল অ্যান্ড রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ অ্যান্ড রাইটস (এসআরএইচআর) বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের অবস্থানকে দৃঢ় করাই দেশজুড়ে স্থাপিত কিশোর-কিশোরী ক্লাবের উদ্দেশ্য।

    সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেন্ডারভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে ‘কিশোর-কিশোরীদের জন্য কর্মকৌশল গ্রহণ করতে হবে। যাতে সমাজের প্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটে। আর এসব ক্লাবের মাধ্যমে পরিচালিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের সচেতন করে গড়ে তুলতে পারবে। এছাড়া ইভটিজিং বন্ধ, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, জন্মনিবন্ধন, বিবাহ নিবন্ধন, যৌতুক প্রতিরোধ, শিশু অধিকার, নারী অধিকার, যৌন নির্যাতন ও নিপীড়ন প্রতিরোধসহ ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিয়য়েও ক্লাবগুলোতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের সচেতন করা হচ্ছে। প্রতিটি ক্লাবের সদস্য সংখ্যা ৩০ জন। এর মধ্যে ২০ জন মেয়ে এবং ১০ জন ছেলে। তাছাড়া সকল ক্লাবের সদস্যরা বিভিন্ন দিবস উদযাপন, খেলাধূলা, বই-ম্যাগাজিন, সংগীত, আবৃত্তি, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, মুক্ত আলোচনা, আন্তঃক্লাব প্রতিযোগিতা ও মার্শাল আট প্রশিক্ষণও নিতে পারবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

    মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, সমাজের বিভিন্ন স্তরে এবং তৃণমূলে কিশোর-কিশোরীরা জেন্ডার বৈষম্য, সেক্সুয়াল হেরেজমেন্ট রোধে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ প্রকল্প এটি। এ প্রকল্পে সমস্যার প্রতিকার ও প্রতিরোধে কিশোর-কিশোরীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারীদের আয়বর্ধক কার্যক্রমের আওতায় আনার জন্যই প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। সংগীত, আবৃত্তিসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তুলে আত্মনির্ভরশীল ও দক্ষ মানব সম্পদে রূপান্তর করার দৃঢ়প্রত্যয়ে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে প্রান্তিক কিশোর-কিশোরীদের সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়নের কার্যক্রম চলছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

    দশ বছর বয়সেই সফল ব্যবসায়ী পিক্সি কার্টিস

    0
    পিক্সি কার্টিস
    পিক্সি কার্টিস

    আজ আমরা এমন এক কিশোরীর কথা বলবো যে তার স্কুল জীবন পার করার আগেই কর্মজীবন থেকে অবসর নিতে চায়! ভাবছেন সেটা আবার কেমন কথা? যার কথা বলতে চাই তাকে কিশোরী বলবো নাকি শিশু বলবো সেটা আপনারাই বিচার করুন। নাম পিক্সি কার্টিস। এখন ওর বয়স মাত্র দশ বছর। এরই মধ্যে সে সফল ব্যবসায়ী হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে।

    সাধারণত সারাজীবনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর আমরা অবসর জীবন উপভোগ করতে পারি। তারপর নিশ্চিন্তে জীবন পার করতে চাই। কর্মজীভন শেষ করতে চায় এক অস্ট্রেলিয় ক্ষুদে শিক্ষার্থী। তবে তার জন্য ৪০ বা ৫০ বছর অপেক্ষা করতে চায় না। সে বরং ১৫ বছর বয়সেই কর্মজীবনে ইতি টানতে চায়। তার পর বাকি জীবন প্রজাপতির মত তার রঙীন ডানা মেলে ঘুরে বেড়াতে চায় দিগন্তের এপার থেকে ওপারে।পিক্সির মায়ের নাম রক্সি জাসেস্কো। গত ডিসেম্বরে রক্সির এই ঘোষণায় সাড়া পড়েগিয়েছিল আন্তর্জাতিক মহলে। বিশ্বজুড়ে এক সময় তা শিরোনামে পরিণত হয়েছিল। এই ছোট্ট মেয়েটি কিসের ব্যবসা করে সেটা অবশ্যই জানানো হবে। তবে জেনে রাখুন তার ব্যাংক একাউন্টে এখন ডলারের ছড়াছড়ি।যদিও সে প্রাথমিক স্কুলের গন্ডিও পার হয়নি এখনো।

    এই বয়সেই খুদে পিক্সির অবসরের পরিকল্পনার কথা জানাজানি হতেই নেটমাধ্যমে সাড়া পড়ে গিয়েছে। তবে একেবারেই অবাক হননি রক্সি। সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারে একটা রসিকতা চালু রয়েছে। আমি ১০০ বছর পর্যন্ত কাজকর্ম করব আর পিক্সি ১৫ বছর বয়সে অবসর নেবে। কে যে স্মার্ট, সে তো বোঝাই যাচ্ছে!’ ছবি: সংগৃহীত

    আপনিকি কল্পনা করতে পারবেন কেউ মাত্র দু বছর বয়স থেকে ব্যবসা শুরু করতে পারে? অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে পিক্সি মাত্র দু বছর বয়স থেকে ব্যবসা শুরু করেছিল। যদিও তার নামে সে ব্যবসা শুরু করেছিলেন মূলত তার মা। তবে ব্যবসায়ী হিসেবে পিক্সি নিজেই দারুণ সফল।সিডনির একটি প্রথম সারির জনসংযোগ সংস্থার সিইও রক্সি জানিয়েছেন তার মেয়ে পিক্সি কচি-কাচাদের চুলের সাজসজ্জার জন্য রকমারি জিনিসপত্র তৈরি করতে ভালোবাসে এবং সেগুলো বিক্রি করে। তার এই ব্যবসার নাম সে দিয়েছে “পিক্সিস বাওস”। সেটা ২০১৪ সালের ঘটনা।যেহেতু মা রক্সি নিজে একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের সিইও তাই তিনিও পিক্সিকে তার পণ্য প্রচারে দারুণ সহযোগিতা করেছিলেন। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই সে ব্যবসা ফুলে ফেপে ওঠে। প্রথম দিকে মুনাফা খুব কম হলেও ছোট্ট পিক্সি মোটেও থেমে থাকেনি বা হতাশ হয়নি। সে এগিয়ে গিয়েছে।

    বিলাসবহুল জীবনের প্রতি আকর্ষণ থাকলেও তার মেয়ের মাথা ঘুরে যায়নি বলে দাবি রক্সির। উল্টে মেয়ের কর্মদক্ষতায় মুগ্ধ তিনি। রক্সি বলেন, ‘আমি ওকে কুর্নিশ জানাই। এই ১০ বছরেই জীবনের অনেকটাই দেখে ফেলেছে ও। তবে এখনও বিনয়ী, দয়ামায়া হারায়নি। বরং মাটির মেয়ে বলতে হবে। বিচহাউস বা ল্যাম্বরঘিনির এসইউভি-র মতো বাড়ি-গাড়ির স্বপ্নপূরণে ওকে অনেক খাটাখাটনি করতে হবে। তবে আমার মনে হয়, সে ওই পথেই এগোচ্ছে।’ ছবি: সংগৃহীত

    করোনা ভাইরাস যখন গোটা পৃথিবীকে থমকে দিয়েছে তখন পিক্সিও অনেকটা গৃহবন্দী। তবে তার মাথা খোলা ছিল। বুদ্ধিকে সে মুক্ত করে ছেড়ে দিয়েছে নতুন নতুন আইডিয়া বের করার জন্য। ফলশ্রুতিতে গত বছর মার্চে সে তার দ্বিতীয় ব্যবসা শুরু করে।যেহেতু গোটা দুনিয়ার ছেলে বুড়ো সবাই গৃহবন্দী,ছোটরা খেলার সুযোগ পাচ্ছেনা তাই পিক্সি ভাবলো খেলনা তৈরি করবে। সত্যি সত্যি তাই করলো। এবার সে নাম দিল “পিক্সিস ফিজেটস”। প্রথম মাসেই অভাবনীয় সাফল্য আসলো এবং কাড়ি কাড়ি ডলার আয় হলো। আপনি সেই লাভের পরিমান শুনলে ঘাবড়ে যাবেন। প্রথম মাসেই তার আয় হলো দুই লাখ ডলার। এমনকি প্রথম ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পিক্সির কোম্পানীর তৈরি সব খেলনা বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। এবার পিক্সি নামে ছোট্ট মেয়েটি আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে তৈরি করলো মূল কোম্পানী। নাম দিলো “ পিক্সিস পিক্স”। আগের দুটি প্রতিষ্ঠান এখন “ পিক্সিস পিক্স” এর আওতাধীন। অনেকটা গুগলের মত।পিক্সির মা বলেন তিনি যতদিন সম্ভব কাজ চালিয়ে যেতে চান অন্যদিকে পিক্সি নিজে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই অবসরে যেতে চান। পিক্সির মা বলেন আপনারাই ভেবে দেখুন কে বেশি স্মার্ট! অবশ্যই পিক্সি। এই বয়সেই পাকা ব্যবসায়ীদের মতই তারও কিছু স্বপ্ন আছে। তার মধ্যে একটি হলো সমুদ্রের কাছে একটা বিচহাউস, গ্যারেজে ল্যাম্বারগিনির মতো দামী গাড়ি। অবশ্যই সে ল্যাম্বারগিনি এসইউভি কিনতে চায়।বিলাসবহুল জীবনের প্রতি আগ্রহ থাকলেও ছোট্ট পিক্সির মাথা ঘুরে যায়নি। পরিবারের সবাই এবং স্কুলের বন্ধুরা পিক্সির কর্মদক্ষতায় মুগ্ধ। সবাই ওকে সম্মান করে ওর দক্ষতা ও সাফল্যে। মাত্র ১০ বছর বয়সেই সে জীবনের অনেকটা দেখে ফেলেছে, বুঝে ফেলেছে। সে খুব বিনয়ী এবং দয়ালু। মাটির মেয়ে বলা চলে।পিক্সির মা অবশ্য চান এতো অল্প বয়সে অনেক সম্পদের মালিক হয়ে মেয়ে যেন বখে না যায় বরং সেই টাকা আরও কত ভালোভাবে বিনিয়োগ করা যায় সেটা ওর ১৫বছর বয়স হলে তিনিই সিদ্ধান্ত নিবেন বা সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবেন।পিক্সির কাছ থেকে পৃথিবীবাসীর শেখার আছে অনেক কিছু।

    জাজাফী

    সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সরকারের পদক্ষেপ

    0
    পথশিশু
    পথশিশু

    পথ থেকে ফেরাতে পথশিশুদের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করানোর উদ্যোগ নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সরকারের পদক্ষেপটি প্রশংসনীয়। শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। ‘একটি শিশুও রাস্তায় থাকবে না, রাস্তায় ঘুমাবে না’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই নির্দেশনা অনুযায়ী শেখ রাসেল দিবসকে ঘিরে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

    সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১৮ অক্টোবর রাসেল দিবস উদযাপন উপলক্ষে গত ২৩ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে দেশের পথশিশুদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্তে জানানো হয়, দেশের পথশিশুদের পথ থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়ে আসার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

    এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক ও শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের সদস্য আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট এটি বাস্তবায়ন করবে। শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার মতো সুযোগ আছে। বিদ্যালয় সময়ের পর তারা শিক্ষার্থী ভর্তি নেয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া করানো হয়। এটি মূলত বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের (বিএনএফ) কাজ।’

    সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সরকারের পদক্ষেপ

    দেশের সুবিধা বঞ্চিত অনূর্ধ্ব ১৫ বছর বয়সী শিশুদের সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া এবং দক্ষতা উন্নয়নের কাজ করে।  এর মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ব্যবস্থা করে থাকে। নতুন এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করারও সুযোগ রয়েছে তাদের।

    সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট ঢাকা বিভাগে ৬৫টি, বরিশাল বিভাগে ২৫টি, চট্টগ্রামে ১১টি, সিলেটে ৫টি, রাজশাহী ২২টি, রংপুরে ৪৭টি খুলনা ১৬টি ও ময়মনসিংহ বিভাগে ১৪টিসহ সারাদেশে ২০৫টি শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া করানো হয়।

    শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের পরিচালক মো. আবুল বাশার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুবিধাবঞ্চিত, হতদারিদ্র শিশুদের লেখাপড়া দক্ষা অর্জন ও প্রয়োজনীয় শিক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয় শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে।  সারাদেশে ২০৫টি শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত বিদ্যালয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়ের পর ৮৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৭৩টি বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করানো হয়। আর বাকি ৪৯টি ভাড়া করা পরিত্যক্ত ভবন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের পর লেখাপড়া করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।  মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পথশিশুদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার কাজ নতুন করেও শুরু করা হচ্ছে।’

    দেশে শিশুদের জন্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শিশু একাডেমি ১৯৯৩ সাল থেকে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ৬৭টি কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশব্যাপী প্রাক-প্রাথমিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে।

    সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজ সেবা অধিদফতরের সরকারি শিশু পরিবার বাবা-মা নেই বা বাবা নেই এমন এতিম শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি শিশু পরিবার পরিচালনা করছে।

    সমাজসেবা অধিদফতরের ছোটমনি নিবাস বাবা-মায়ের পরিচয়হীন শূন্য থেকে সাত বছর বয়সী পরিত্যক্ত, পাচার থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুদের লালনপালন ও সাধারণ শিক্ষা দেওয়া হয়। আর বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশন (বিএনএফ)  নারী ও শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার কাজ করে।

    দেশের পথশিশুদের চিত্র

    বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ পথশিশু রয়েছে বলে বিভিন্ন সংগঠন থেকে দাবি করা হয়। তবে এই পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কারা পথশিশু আর কারা পথশিশু নয় তা নিয়ে রয়েছে ভিন্ন মত। স্ট্রিট চিলড্রেন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক (স্ক্যান) সভাপতি জাহাঙ্গীর নাকির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের পথশিশুর প্রকৃত সংখ্যা জানতে হলে প্রথমেই পথশিশুর সংজ্ঞা ঠিক করতে হবে। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সার্ভে অনুযায়ী ওই সময় ছিল ৬ লাখ ৭৯ হাজার এবং ২০১৪ সালে ১১ লাখ ৪৪ হাজার এবং ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ১৬ লাখ হবে বলে বলা হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হয়ে থাকে বর্তমানে পথশিশুর সংখ্যা ১৩ লাখ। এর মধ্যে ঢাকা শহরেই সাড়ে ৪ লাখ পথশিশু আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

    সরকারি-বেসরকারি পথশিশু কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য একটি ক্রস সেক্টর বডি থাকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। শিশু বাজেট যথাযথভাবে ব্যয়ের জন্য একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

    বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার

    বর্তমান সরকারের ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারের লক্ষ্য ও পরিকল্পনায় বলা হয়েছে ‘পথশিশুদের পুনর্বাসন ও নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা, হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল শিশুদের জন্য শিশুসদন প্রতিষ্ঠা এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা উন্নত ও প্রসারিত করা হবে।

    ‘একটি শিশুও রাস্তায় থাকবে না, রাস্তায় ঘুমাবে না’-  প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে হবে বলেও পরিকল্পনায় উল্লেখ আছে।

    তথ্যসুত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন

    ছবিঃ ইন্টারনেট।

    পরীক্ষার বোঝা নয়, শিশুরা বেড়ে উঠুক আনন্দময় শিক্ষায়

    0

    ১৭৮৯ সালে ইংরেজ কবি উইলিয়ম ব্লেক ‘দা স্কুল বয়’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন। স্কুল পড়ুয়া বালকটি স্কুলের দমবন্ধ পরিবেশে হাঁপিয়ে উঠেছে। শিক্ষকদের কঠোর এবং আনন্দহীন শিক্ষাদানে সে অসুখী বোধ করেছে। বরং সে স্কুলের বাইরে গ্রীষ্মকালীন সকালে প্রতিটি গাছে পাখির গান উপভোগ করতে চেয়েছে। সে তার বাবা-মাকে স্কুলের ওই গোলামি থেকে উদ্ধার করতে মিনতি জানিয়েছে। ২০২১ সালের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আজও আমরা ব্লেকের কবিতায় উল্লেখিত সেই বালকটির করুণ মিনতির প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। বালকটি মূলত আমাদের শিশুদের প্রতীকী রূপ। শিক্ষা লাভ করা প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার এবং এই শিক্ষা অবশ্যই আনন্দের ভেতর দিয়ে হতে হবে। আর সেই আনন্দের অন্তর্তলে থাকবে আকর্ষণও। শিক্ষার্থীর মনে স্বপ্ন জাগিয়ে দিতে হবে যে স্বপ্ন সে ঘুমিয়ে দেখবে না। বাস্তবে সেই স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাবে।

    বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দেখা যায়, প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রমে আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা লাভের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়া শুরু হয় ক্লাস ওয়ান অথবা স্টান্ডার্ড ওয়ান থেকে। এই ক্লাসে ভর্তির আগেই শিশুদের পড়াশোনা করে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে যেতে হয়। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৯-এর শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উষ্মা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘শিশুরা প্রথমে স্কুলে যাবে এবং হাসি-খেলার মধ্যে দিয়েই লেখাপড়া করবে। তারা তো আগে থেকেই পড়ে আসবে না। পড়ালেখা শিখতেই-তো সে স্কুলে যাবে’।

    প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষাদানের বিষয়টি অনুপস্থিত ছিল বটে তবে সেখানে পরীক্ষা ভীতি ছিল না। ২০০৯ সাল থেকে প্রাথমিকে সমাপনী পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর শিশুদের রূপকথাময় শৈশবকে পুরোপুরি গলা টিপে হত্যা করা হলো। মূল বইয়ের পাশাপাশি তাদের পড়ার টেবিলে গাইড বইয়ের সমারোহ দেখা গেল। মায়েরা সন্তানদের নিয়ে কোচিং সেন্টারে দৌড়ঝাঁপ শুরু করলেন। দশ বছরের একটি শিশু বোর্ডের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে- এ বিষয়টি পরিবার ও শিশুর জন্য কতটা চাপ সৃষ্টি করছে- তা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কেউ-ই বিবেচনায় নিলেন না। শুধু ক্লাস ফাইভে নয় ক্লাস এইটেও ২০১০ সাল থেকে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা নেওয়া শুরু হলো। ফলে শিশুরা পরীক্ষা ভীতির ভেতর দিয়েই বেড়ে উঠল। নির্ভার এবং আনন্দময় একটি শৈশব কাটানো যে শিশুর জন্মগত অধিকার তা দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়া হয়েছে।

    কোনো কিছুই আর শিশুর জীবনে তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরিয়ে দেবে না। মুখস্থ নির্ভর লেখাপড়ার ইতি টানার লক্ষ্যে ২০০৮ সাল থেকে মাধ্যমিকে এবং ২০১২ সাল থেকে প্রাথমিকে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। বলা হয়েছিল এই পদ্ধতির অনুশীলনে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান এবং দক্ষতায় অনেক দূর এগিয়ে যাবে। বাস্তবে দেখা গেছে তেমন কিছু ঘটেনি। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকেরা এই পদ্ধতি ঠিকঠাক বুঝতে পারেননি। তবে পুস্তক ব্যবসায়ীরা খুব ভালো ব্যবসা করেছেন। কোচিং সেন্টারও ছিল রমরমা।

    এ সব নানা দোলাচলের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করেছে এবং তা বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। নতুন এই শিক্ষাক্রমের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া হবে আনন্দময় পরিবেশে। মুখস্থ নির্ভর পড়াশোনা সেখানে থাকছে না।

    বিষয় ও পাঠ্যপুস্তকের চাপ ও বোঝা কমানোর কথা বলা হয়েছে। সনদের জন্য নয় বরং জ্ঞান এবং দক্ষতায় পারদর্শী হতে শিক্ষার্থীকে অনুপ্রাণিত হতে বলা হয়েছে। পরীক্ষার চেয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা রাখা হয়নি। এসব শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করা হবে শিখন কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে। চতুর্থ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে মূল্যায়নের পাশাপাশি পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কোভিড-১৯ পরবর্তী সময় এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় দশ ধরনের শেখার ক্ষেত্র নির্বাচন করা হয়েছে। বিষয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য : ভাষা ও যোগাযোগ, জীবন ও জীবিকা, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি।

    ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ভাষা। এই ভাষাগত দক্ষতা আমাদের শিক্ষার্থীরা কতটা অর্জন করছে সেটি নিয়ে অনেক কথা নানা দৃষ্টিকোণ থেকেই বলা যায়। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ করে যখন তারা চাকরির জন্য আবেদন করে তখনই বোঝা যায় তাদের ভাষাগত পারদর্শিতা কতটা! আবার দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে পড়ার পরেও ইংরেজি লেখা এবং বলার দক্ষতা অধিকাংশ শিক্ষার্থীই অর্জন করতে পারে না। এ কারণেই ভাষা ও যোগযোগ বিষয়টি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ১০টি বিষয়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: জীবন ও জীবিকা। হার্বাট স্পেনসারের মতে, ‘শিক্ষার কাজ হল মানুষকে জীবন ও জীবিকার উপযোগী করে তোলা’। মানুষকে জীবিকার উপযোগী করে তোলা অনেকটাই সহজ বলে মনে হয়, তবে জীবনের উপযোগী করে তোলা খুব সহজ কাজ নয়।

    জীবন কী? জীবনের সঙ্গে পৃথিবীর সবকিছুই জড়িয়ে রয়েছে। শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে জীবন ঘনিষ্ঠ সকল কিছুর সঙ্গে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে যুক্ত করে দেওয়া যেন সে আদর্শ নাগরিক হতে পারে। স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল-কথাটি আমরা শিশুকাল থেকেই শুনছি। অথচ কে না জানে আমাদের দেশে নানা অছিলায় শারীরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি সবচেয়ে অবহেলিত। মানসিক স্বাস্থ্যের কথা আমাদের মতো দেশে বলতে গেলে ভাবাই হয় না। যে কোনো কাজের পূর্বশর্ত সুস্থ থাকা। শিক্ষার্থীরা যদি শারীরিক এবং মানসিকভাবে সুস্থ না থাকে তবে তারা লেখাপড়া শিখবে কীভাবে? বিশেষ করে তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যবোধ ও নৈতিকতা শিক্ষার্থীরা নিশ্চয় পরিবার, বিদ্যালয় এবং খেলার মাঠের পরিবেশ এবং শিক্ষকের কাছ থেকেই শিখবে। শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন না করলে শিক্ষার্থীরা ভাষা, জাতি, দেশ এবং বিশ্বকে পুরোপুরি নিজের ভেতরে ধারণ করতে পারবে না।

    পরিবারের বাইরে শিক্ষার্থী প্রথম সমাজীকরণের মুখোমুখি হয় বিদ্যালয়ে। শিক্ষকের ভূমিকাই সেখানে মুখ্য। শিক্ষককে হতে হবে দয়ালু, যত্নবান ও শিক্ষার্থী-বান্ধব। সর্বোপরি অপরিসীম ভালোবাসা নিশ্চিতভাবেই শিক্ষকের থাকতে হবে শিক্ষার্থীর প্রতি। শিক্ষক যে বিষয়ে পড়াবেন সে বিষয়ে অবশ্যই তার পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকের নিজের জীবন হতে হবে নির্ভার ও আনন্দপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে মেধাবী এবং তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আসতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাদের আর্থিক সচ্ছলতা এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়টি খুবই প্রাসঙ্গিক। এ বিষয়ে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অভিজ্ঞতা গ্রহণ করা একান্ত জরুরি।

    নতুন শিক্ষাক্রমে মূল্যায়নকে পরীক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে-এটি অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। সহশিক্ষা কার্যক্রমের ভেতর দিয়ে শিক্ষার্থী জ্ঞান অর্জন করবে-এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসবে এই শিক্ষাক্রম যে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা ও মানসিকতা নিয়ে। সহশিক্ষা কার্যক্রমের ভেতর দিয়ে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়নে স্বচ্ছতা এবং বিশ্বস্ততার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে সরকারকে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি আস্থা এবং বস্তুনিষ্ঠার জায়গাটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। সহশিক্ষা কার্যক্রমের যে বিষয়েই শিক্ষার্থীর শিখন প্রক্রিয়া চলুক না কেন তা সম্পন্ন হতে হবে আনন্দের ভেতর দিয়ে। সহশিক্ষা কার্যক্রম একজন শিক্ষার্থীকে কৌতূহলী, সৃজনশীল এবং তার বুদ্ধিমত্তার সঠিক বিকাশ ঘটাতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।

    ২০১০ সালে প্রণীত শিক্ষানীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়া সত্ত্বেও সরকার ঘোষিত নতুন শিক্ষাক্রমকে মহৎ উদ্যোগ বলতেই হয়। তবে এই শিক্ষাক্রমকে সফলতার দরজায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ প্রয়োজন তা কী সরকারের নাগালের মধ্যে রয়েছে? পাঠ্যবই তৈরি করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা-সেটি যথাযথ উদ্যোগ। তবে এত কম সময়ে কী মানসম্পন্ন, যুগোপযোগী এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পাঠ্যবই রচনা করা সম্ভব? বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের অন্যটি হচ্ছে-শিক্ষক। মানসম্পন্ন শিক্ষক ছাড়া কোনোভাবেই এই শিক্ষাক্রম ফলপ্রসূ হবে না। আসলে পুরো বিষয়টিই চ্যালেঞ্জিং।

    সৈয়দা আইরিন জামান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

    সুত্রঃ প্রথম আলো

    আমি বড় হতে চাই

    রাশিদুল রাজ

    ইদানীং খুব বেশি বেশি সপ্ন দেখতেছি

    অকল্পনীয় কোনো কিছু হাতে পাওয়ার,

    অনেক বড় হওয়ার তীব্র ইচ্ছে

    প্রতিনিয়ত আমার ব্রেইন কাপায়।

    আমি যে বড় হতে চাই।

    যদিও খুবই ক্ষুদ্র আমি,নিশ্চুপ ছোট আমি

    তবুও যে অনেক বড় হতে চাই

    এত্তো বড় যে আশপাশ অবাক হয়ে তাকিয়ে রবে

    যেনো প্রকৃতির নিয়ম বিরুদ্ধ কোন কাজ

    আমি যে বড় হতে চাই।

    ঘুমহীন রাত্রিতে হঠাৎ সপ্ন দেখি

    কিংবা ঘুমন্ত রাত্রে সপ্ন আমার ঘুম ভেঙ্গে দেয়,

    উঠে বসি কিছুক্ষণ,

    ভাবি এতো ঘুমোলে কি সপ্ন দেখা যায়?

    আমি যে বড় হতে চাই,কত যে কাজ বাকী!

    ইচ্চেঘুড়িরা উড়ে বেড়ায়

    ডালপালা যুক্ত গাছেরা নিশ্চুপ হয়ে যায়

    পাহার পর্বতেরা তাদের কম্পন থামিয়ে দেয়।

    জলন্ত তারাগুলোও যেনো নির্জীব হয়ে যায়

    আমার স্বপ্ন পুরন দেখার তাদেরও যে খুবই ইচ্ছে।

    চারিদিকে কতশত বাঁধা

    সপ্নপুরনের চেয়ে সপ্ন ভাঙ্গারই খেলা সব

    কেউ যাহা চায়,তাহা নাহি পায়

    কিংবা তার চেয়ে বেশি পেয়েও সে তাহা দেখে না।

    তারপরেও আমি আমার বিশুদ্ধ সপ্ন দেখে যাই

    রঙ্গিন সপ্নে আমিও যে বড় হতে চাই।

    কবি-রাশিদুল রাজ
    শিক্ষার্থী ,সরকারি তিতুমীর কলেজ

    শৈশব স্মৃতি

    6
    শৈশব স্মৃতি

    লেখকঃ মো নাফিজ বিন জামাল 


    পুকুরের জলে ঢিল ছুঁড়ে দেখেছেন কখনও? অনেক দূর পর্যন্ত গোল ঢেউগুলো ছড়িয়ে যায়! আমাদের মনের মধ্যে যে নির্জন দুপুরের শান্ত পুকুরটা আছে, কখনও সেখানে ঢিল ছুঁড়ে দেখবেন, আপনি নিজে ভাবতেও পারবেন না, অজান্তেই সেখানে এসে যেতে পারে তোলপাড় করা সুনামির ছোট-মেজ-সেজ অথবা বড় ঢেউ! পুরাণের গল্পে সমুদ্র-মন্থন হয়েছে যখন, মন-মন্থনেই বা দোষ কি! ক্ষতি তো বিশেষ কিছু হবে না, ম্যাক্সিমাম গরলামৃতের স্যান্ডউইচে আপনি কিছুক্ষণ নাস্তানাবুদ হবেন! রংচটা-ফিকে-বিবর্ণ কিছু স্মৃতি এসে পড়বে সামনে । পুরনো সেই দিনের কথা ভেবে একটু হাসবেন, হয়তো বা একটা দীর্ঘশ্বাস! মনের কোণের আলমারিতে রেখে দেওয়া, ধুলো পড়া অ্যালবাম থেকে কিছু ছবি ছড়িয়ে যাবে চারদিকে!এত ভণিতার কারণ, আমি নিজে আসলে বেশ নাস্তানাবুদ হলাম এরকমই একটা ছোট-খাটো সুনামির ধাক্কায়, অবশ্যই মনের মধ্যে । সুনামিটা এল কেন, সেটা না হয় শেষে বলব আপনাদের । তার আগে বরং মনের ভিতরে রাখা পুরনো অ্যালবামের যে ছবিগুলো ছত্রাকার হয়ে গেল সেগুলো একটু গুছিয়ে নিই ।


    সে অনেকদিন আগের কথা….তখন electricity চলে গেলে জেনারেটর ছাড়া হতো না সহজে।অন্ধকারের সাথে ছুটে আসতো জোনাকির দল। বিল্ডিং এর বাচ্চা কাচ্চারা নেমে পড়তো রাস্তায় জোনাকিপোকা ধরার জন্য। রাতে আকাশে চাঁদ উঠতো। চাদের আলোয় আমরা সেই জোনাকিপোকার পেছনে ছুটতাম। বিল্ডিং জুড়ে আড্ডার আসর বসতো,কোনো আংকেল হঠাৎ হয়তো  হেড়ে গলায় গান ধরতো।  ২০০২ এর  world cup এর সময় বাসায় টিভি কেনা হলো। বিটিভিতে খেলা দেখার জন্য রাত জেগে অপেক্ষা করতাম আমি আর আব্বু। টিভিতে একটু সমস্যা হলে antenna নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যেতো।পরিবারের সবাই মিলে তখন শুক্রবারে তখন বাংলা সিনেমা দেখতাম।অনেকদিন হলো সেই family মুভি show তে আর নায়ক নায়িকারা ডিসুমডাসুম করে না।স্কুল থেকে ফেরার সময় ছাতা গলিয়ে বৃষ্টি তে ভেজা হয়না আর।


    আমি বড় হয়েছি সিলেট ক্যাডেট কলেজ ক্যাম্পাসে।তখন শুক্রবারে কলেজে হাড়িপাতিল আর পাপড় নিয়ে ফেরিওয়ালা আসতো। খা খা দুপুরে আকাশে চিল উড়ে বেড়াতো। আম্মু ঘুমিয়ে পড়লে আমি লুকিয়ে ছাদে উঠতাম চিল দেখার জন্য। কখনো বা আব্বুর ড্রয়ার থেকে লুকিয়ে দুই টাকা দিয়ে ফেরিওয়ালার সেই পাপড় কিনতাম।ঈদ গুলোতে সালামি পাইতাম ১০ টাকা,সেই ১০ টাকার আনন্দ এখন ১০০০ টাকার সালামি তেও পাওয়া যায় না।
    স্কুল লাইফে যে আমাদের একটা gang ছিলো। তার মধ্যে আমি আর Sakin Hossain শুধু কথা বলার জন্য ধরা খাইতাম  Sir দের কাছে। Wahid Hasan Chowdhuryখালি Shirt এর পেছনে দাগ দিয়ে দেওয়ায় ওস্তাদ ছিলো । Nigar Sultana Anika আর আমি খালি ঝগড়া করতাম।ব্লাকবোর্ডের  চক ছোড়াছুড়ি দিনগুলো আজ শুধুই স্মৃতি । স্কুলের পেছনে একটা বধ্যভূমি ছিলো। ওইটা ছিলো আমাদের কৌতুহলের প্রধান উৎস। কতো ভুতের কাহিনি শুনতাম ঐ জায়গার।আজও হয়তো সেই ভুতগুলো আমাদের মতো অনেকের আড্ডার আসরকে তাড়া করে ফেরে। বৃত্তি পরীক্ষায় কে কার চেয়ে ভালো বইটা প্রাইজ পেয়েছে এটা নিয়েও  অনেক স্মৃতি আছে ঐ শ্ব র্য  তা হয়তো আরও ভালো বলতে পারবি । 


    সন্ধ্যার আজান হলেই ঘরে ফেরার টাইম হয়ে যেতো, কারন সন্ধ্যার সময় ঘরের বাইরে থাকা বারন ছিলো। আমি প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় বারান্দার আকাশে সন্ধ্যাতারা দেখতাম অনেক্ষন। ভুতুড়ে রাতের নির্বাক নেমে আসা উপলব্ধি করতাম।আমাদের বিল্ডিং এর পেছনে বড় একটা গাছ ছিলো, প্রতিদিন সেই গাছটায় একজোড়া মাছরাঙা পাখি এসে বসতো আর ওদের দেখার জন্য আমিও  সকালবেলা  বারান্দায় পড়তে বসতাম । ওরা কখনো না আসলে আমার মনটা  ও অনেক খারাপ হয়ে যেতো আসলে তখন মন খারাপের কারণ গুলাও ছিল অদ্ভুত। আজও শীত আসে। কিন্তু শীতের সকাল গুলোর নির্মল শুভ্র স্নিগ্ধতা, ভোরবেলার জমে থাকা শিশির গুলো স্কুল থেকে ফেরার পথে যেভাবে ছুয়ে ছুয়ে দেখতাম এখন আর কিছুই এভাবে উপলব্ধি করা হয়না।হয়তো বড্ড যান্ত্রিক হয়ে গেছি আমরা।সময়ের প্রয়োজনে সবাইকে বদলে যেতে হয়।আমরাও এর ব্যতিক্রম নই। 


    রবিন্দ্রনাথ এর একটা কথা খুব মিলে যায় আমার এই লেখাটার সাথে – “তখন খুব একটা কিছু লাগে নাই।কিন্তু জীবনের এহেন অবস্থায় উপনীত হইবার পর বোধ হইতেছে যাহা ছাড়িয়া আসিয়াছি তাহাই উত্তম ছিল।নির্ভেজাল । দুশ্চিন্তার বালাই নাই। তবে” অধিকার ছাড়িয়া দিয়া অধিকার ধরিয়া রাখার মতন বিরম্বনা আর নাই” – আসলেও সত্য।

    লেখকঃ মো নাফিজ বিন জামাল

    এক্স ক্যাডেট, কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ

    আঁধার ঘনিয়ে আসে

    3
    আঁধার ঘনিয়ে আসে

    লেখকঃ অনিক আরণ্যক

    গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলার সময় আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম – গাছগুলো সব কোথায়!

    চারিদিকে ঝোপঝাড়, এলোমেলো গাছগাছালি, তার ঠিক মাঝখানটায় একেবারে ফাঁকা! এখানে যে সব বড়বড় অশুথ, হিজল আর শিল গাছ গুলো ছিল, সব শুদ্ধ হাওয়া।কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোও কেটে নেয়া হয়েছে।এত স্বর্গীয় রক্তিম গাছ কেউ কাটতে পারে আমার বিশ্বাস হয় না।সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের কি কোনো দায়ভার নেই? পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর সবকিছুই মানুষ নামক প্রাণীরা ধ্বংস করে দিচ্ছে একে একে।বিস্তীর্ন তৃণভূমিকে বানানো হয়েছে লোকালয়, কলকারখানা।খাল-নদী ভরাট করে চলছে দখলদারী।বিষাক্ত কার্বনে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে আবহাওয়া।বেহেশতের মত সুন্দর এই ধরনীকে নরকে করা হচ্ছে পরিণত।বিনিময়ে কী পাচ্ছি? কাড়ি  কাড়ি টাকা, আকাশচুম্বি দালানকোঠা,সভ্যতা? শিল্প-বিপ্লব আর পূঁজিবাদের আড়ালে আমরা কখন যে পৃথিবীকে ধ্বংস করে চলেছি নিজেরাও জানি না।আসলে জানি, কিন্তু ক্ষনিকের লাভের আশায় না জানার ভান করে থাকি।অথচ মাতৃতুল্য পৃথিবী নষ্ট হলে আমরাও যে বাচবোনা, আমাদের প্রজন্ম যে থাকবে না, এটা কেউ ভাবতে চাইছে না।

    বিষন্ন মনে জঙ্গলের  গাছগাছালিহীন শুন্যতার দিকে তাকিয়ে আছি।এই শুন্যতা মানুষের অদূর ভবিষ্যতের শুন্যতার কথা ভাবায়।যেনো বলতে চাইছে- এখন না শুধরালে এক সময় আমার মতই মানুষের পরিণতি হবে।

    জঙ্গলের এই ফাঁকা অংশে সবচেয়ে বেশি কাঠ দেয়া গাছগুলো ছিল।মেহগনি, শিল কড়ই, হিজল, অশুথ আরও নাম না জানা গাছ।তার মধ্যে কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো ছিল আমারই হাতে লাগানো।তখন আমার বয়স সাড়ে চার কী পাঁচ হবে।একদিন সকালে লোকজনের হৈ হল্লায় ঘুম থেকে উঠে গেলাম।বাবার হাত ধরে উঠোন পেরিয়ে খোলা রাস্তায় এসেই দেখি জঙ্গলের গভীর থেকে কালো ধোয়া কুন্ডলী পাকিয়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে! আমাদের গ্রামের উত্তর দিকে চাষাবাদের জমি আর দক্ষিণে এই ঘন জঙ্গল।যেটা আমাদের পাড়ার একদমে ঠিক পেছনেই।জঙ্গলের শেষমাথায় অর্থাৎ সর্ব দক্ষিণে রয়েছে নদী। যে নদীটা আরো পাঁচগ্রাম পেরিয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে।

    গ্রামবাসীরা শুকনো পাতা আর মরা কাঠ সংগ্রহে যেত এই জঙ্গলে।তাদেরই কারো অসতর্কতায় হয়ত জঙ্গলে আগুন লেগে থাকবে।গ্রামবাসীর শত চেষ্টায়ও সে আগুন নেভানো সম্ভব হয় নি।হতাশ গ্রামবাসী দেখলো জঙ্গলের করুণ দশা।আমাদের প্রার্থনা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।পুরো একদিন অগ্নি তার তান্ডব লীলা চালালো।সকলে বলাবলি করছিল- “এভাবে চলতে থাকলে আমাদের রক্ষাকারী এ বন ধ্বংস হয়ে যাবে।“

    ঐ সময় অবুঝ বাচ্চা হিসেবে আমি জানতাম না জঙ্গল আমাদের ঠিক কীভাবে রক্ষা করে! আমার ধারণা ছিল জঙ্গলে শুধু ভূত থাকে!

    সেদিন রাতে এক অবাক করা ঘটনা ঘটল।হঠাৎ করেই মেঘের গর্জন দিয়ে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল।এত ভারি বর্ষন গ্রামবাসী বিগত বছরগুলোয় কখনো দেখেনি।যেন ঈশ্বর গ্রামবাসীর আর্তনাদ শুনেছেন। সেই বৃষ্টিতেই আগুন ধীরে ধীরে নিভে গেল।রক্ষা পেল বন।

    সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এলে বাবার উদ্যোগে গ্রামবাসীরা মিলে জঙ্গলের সে পোড়া অংশ সাফ-সাফাই করলেন।মাটি পরিস্কার করলেন, তারপর সকলে মিলে শাল, কড়ই অশুথ, হিজল আরো নাম না জানা গাছের চারা লাগালেন।সেই সময়ই বাবা আমার হাতে তুলে দিলেন কিছু কৃষ্ণচূড়া গাছের চারা।আমি বাবার পাশে থেকে চারা গুলো লাগালাম।সেদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম-‘আচ্ছা বাব জঙ্গল আমাদের কিভাবে রক্ষা করে?‘

    বাবা চারা গাছ লাগাতে লাগাতে আমাকে বোঝাতে লাগলেন।আমি সেদিন জানতে পারলাম আমাদের বেচে থাকার জন্য গাছ কতোটা জরুরি।জানতে পারলাম গাছ থেকে আমরা অক্সিজেন পাই, জ্বালানী কাঠ পাই, খাদ্য পাই।বুঝতে পারলাম এ জঙ্গল আমাদের জলোচ্ছাস আর নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে চলেছে যুগের পর যুগ! সবচেয়ে জরুরি কথা এ জঙ্গল আমাদের গ্রামকে বছরের পর বছর সমুদ্র থেকে ধেয়ে আসা ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা করে চলেছে!

    জঙ্গল যে আমাদের ঝড়ের হাত থেকে বাঁচায় তা আমি প্রত্যক্ষ করলাম ২০০৭ সালে “সিডর“এর সময়।তখন আমার কৈশর বয়স।ঘূর্ণিঝড় সিডরে আমাদের পাশের গ্রামগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হলেও এই জঙ্গলের কারনে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি খুবই সামান্য হয়।তখন থেকেই এ জঙ্গলের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ভালোবাসা গভীর হল।আমি বুঝতে পারলাম আমাদের জীবনের একটা অংশ জুড়ে আছে এ জঙ্গল।

    তার কিছু মাস পর আমাকে শিক্ষার জন্য শহরে পাড়ি জমাতে হয়।সবুজের সাথে শহরের কোনো লেনাদেনা নেই।হঠাৎ করেই যেনো স্বর্গ থেকে নরকে চলে এলাম।জীবণ সংগ্রামের জন্য মানুষকে কত কিছুই না করতে হয়! শিক্ষা শেষ করে একটা কোম্পানিতে চাকরী শুরু করি আর অর্থ জমাতে থাকি, আমার শৈশব-কৈশর কাটানো গ্রামের জন্য কিছু করার প্রয়াস থেকে।

    দীর্ঘ তেরো বছর পর আজ আবার সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে গ্রামে ফিরে এলাম।

    কিন্তু একি! গ্রাম কোথায়! এ যেনো ইট পাথররে স্তুপে চাপা পড়া গলিত লাশ! দোতলা, তিন তলা বাড়ি।পাকা রাস্তা-ঘাট।নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে একের পর এক ইটের ভাটা।আর জঙ্গলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স-মিল গুলো।সেখানে বড়বড় গাছের গুড়িগুলোকে নির্মমভাবে কেটে কেটে ফালি ফালি করা হচ্ছে।কোথায় আমার সবুজ গ্রাম? এ যেনো কাঠ আর ইটের পাতালপুরী।পুঁজিবাদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে আমার সবুজ গ্রামও রেহাই পায় নি।

    গ্রামের এ বেহাল দশা আমি সইতে পারলাম না।আনমনেই জঙ্গলের দিকে ছুট লাগালাম।মনে হল একাকী জঙ্গলের সবুজে মিশে মৃতপ্রায় গ্রামের জন্য একটু আর্তনাদ করে উঠি, পুরোনো গ্রামের জন্য কাঁদি।ঝোপঝাড় আর বাঁশবন পেরিয়ে আসতেই আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম- গাছগুলো সব কোথায়?

    আমার শৈশব কৈশরের মত চিরসবুজ গাছগুলোও আর নেই।শুধু পড়ে রয়েছে শূন্যতা! সেই শূন্যতার দিকে ছলছল চোখে দাড়িয়ে রইলাম।সূর্য ডুবি ডুবি করছে।

    নীড়ে ফিরে যাওয়ার মত কোথাও কোনো পাখি নেই।দূরে কোথাও শেযালের কান্না শোনা যাচ্ছে।যেন অভিশাপ দিচ্ছে মানুষ নামক দানব গুলোকে।ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে চারিদিক।মানুষের ভবিষ্যতের মতেই অন্ধকার।

                                                       

    রুমকির বাল্যবিবাহ আমরা বন্ধ করে দিয়েছি,ও আবার স্কুলে যাচ্ছে

    0

    আমার সব থেকে প্রিয় বান্ধবীর নাম রুমকি।আমরা একসাথে স্কুলে যেতাম একসাথে স্কুল থেকে ফিরতাম এমনকি একসাথে মরতেও যেন রাজি ছিলাম আমরা।লোকে বলতো আমরা দুজন জমজ বোন হলে ভালো হতো।আমাদেরও খুব ভালো লাগতো।আমরা যখন একটুখানি বড় হলাম তখন দুজনে দুষ্টুমীর ছলে সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা যখন বিয়ে করবো তখন একই পরিবারের দুই ভাইকে বিয়ে করবো যেন আমরা তখনো একসাথে থাকতে পারি।মানুষের সব স্বপ্ন পুরণ হয়না যেমন আমাদের স্বপ্নগুলো হঠাৎ করে ভেঙ্গে গেল।এক সকালে রুমকি আর স্কুলে এলোনা।আমি ভাবলাম ওর মনে হয় জ্বর হয়েছে তাই স্কুলে আসেনি।ওর আবার এই এক সমস্যা ছিল একটুতে একটু রোদ বৃষ্টিতে থাকলেই জ্বর বাধিয়ে বসতো।ভাবলাম পরদিন নিশ্চই জ্বর সেরে যাবে আর ও স্কুলে আসবে।কিন্তু পরদিনও ও স্কুলে আসলো না।ওদের বাড়ি ছিল অন্য একটা গ্রামে।আমরা যখন হেটে হেটে স্কুলে যেতাম তখন একটা তিন রাস্তার মোড়ে দুজন একসাথে হতাম।বন্ধের দিনগুলিতে ও আমাদের বাড়িতে আসতো নয়তো আমি ওদের বাড়িতে যেতাম।সব্বাই আমাদেরকে চিনতো জানতো।পরপর চার পাচদিন হয়ে গেল রুমকি আর স্কুলে এলো না।আমি খুব অবাক হলাম।ওর অসুখ হলেতো আমাকে জানাতে পারতো আমি গিয়ে দেখে আসতাম।

    স্বর্ণকিশোরী সারা

    রুমকি একাই ওদের গ্রাম থেকে আমাদের স্কুলে পড়তে আসতো।গ্রামের পাশেই আরেকটা স্কুল থাকার পরও ও আমাদের স্কুলে আসতো কারণ আমাদের স্কুলটা ছিল খুব ভালোমানের।আমরা লেখাপড়ায় যেমন অন্যদের চেয়ে ভালো ছিলাম তেমনি কালচারালা ফাংশানগুলোতেও আমাদের খুব নাম ছিল।রুমকি খুব ভালো গান করতে পারতো কিন্তু সুযোগ সুবিধার অভাবে ওর সুন্দর গলার গান থেকে বঞ্চিত হলো সারা দেশ।বাবা মার অভাবের সংসারে রুমকি যে স্কুলে আসতে পারছে এটাই যেন রুমকির জীবনের সব থেকে বড় অর্জন ছিল।এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে কিছুদিন পর।আমরা এসএসসি দিবো।ক্লাসে রুমকির অবস্থান বেশ ভালোই।তিন থেকে পাচের মধ্যেই থাকে ও।স্কুলের শিক্ষকেরা ওকে নিয়ে আশাবাদী ও নিশ্চই স্কুলের সুনাম বাড়াবে।কিন্তু হঠাৎ সব ওলোটপালট হয়ে গেল রুমকি আর স্কুলে এলো না।একদিন দুদিন করে করে যখন প্রায় পনেরদিন হতে চললো তখন আমার আর সহ্য হলোনা।সব থেকে প্রিয় বান্ধবীকে ছাড়া আমিও যে স্কুলে ক্লাসে মন বসাতে পারছিলাম না।সেদিন সারাকে নিয়ে আমি রওনা হলাম রুমকিদের বাড়িতে।আমাকে জানতেই হবে রুমকি কেন স্কুলে আসে না।বাবা মা আর ভাইয়াকে বলে গেলাম রুমকির কথা।ওর স্কুলে না আসার কারণ কি হতে পারে সেটা ভাইয়া অনুমান করলো যা শুনে আমি চমকে উঠলাম।ভাইয়া বললো ওর বিয়ে হয়ে যেতে পারে!

    স্বর্ণকিশোরী ফারিহা ইসলাম তিফলা ও তার বন্ধুরা

    এবার যে মেয়েটি এসএসসি পরীক্ষা দিবে তার কি বিয়ের বয়স হয়েছে?আমাদের দেশে না বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ? আমাদের দেশেনা মানবাধিকার কমিশন আছে,ইউনিসেফ,সেভ দ্য চিলড্রেন আরো কত কত প্রতিষ্ঠান আছে শিশু কিশোর কিশোরীদের নিরাপত্তা ও অধিকার আদায়ের জন্য?তারাকি তবে রুমকির বিয়েটা রুখে দিতে পারেনা?আমি মনে মনে ভাবি ভাইয়া যেটা বলেছে সেটা যেন না হয়।রুমকি অসুস্থ হলেও মনকে শান্তনা দিতে পারবো কিন্তু ওর যদি সত্যি সত্যিই বিয়ে হয়ে যায় তাহলে কি করবো?ভাবতে ভাবতে সারাকে কথাটা বললাম।সারাও শুনে মনখারাপ করলো আর পথে যেতে যেতে পরিকল্পনা করলো যদি গিয়ে দেখা যায় রুমকির বিয়ে হয়ে গেছে তাহলেতো কিছু করার থাকবে না আর যদি জানা যায় ওর বিয়ে হয়নি শুধু বিয়ে ঠিক হয়েছে তাহলে কি কি করতে হবে।সারা স্বর্ণকিশোরী।ওর কথাগুলো শুনে বেশ সাহস পেলাম।ওরা বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করে।স্বর্ণকিশোরীরা সব সময় কিশোরীদের নানা অধিকার নিয়ে সোচ্চার।গিয়ে দেখা গেল সত্যিই ভাইয়া যা বলেছিল ঠিক তাই হয়েছে।আমার বান্ধবী রুমকির বিয়ে ঠিক হয়েছে আর সে জন্যই ওর বাবা মা ওকে স্কুলে যেতে দেয়নি।আজ বাদে কাল বিয়ে।আমরা ওর বান্ধবী বলে ওর বাবা মা তেমন কিছু বলেনি বরং ওর সাথে দেখা করতে দিয়েছে তবে অন্য কেউ নাকি ওর সাথে এ কয়দিন দেখা করা বা কথা বলার সুযোগ পায়নি।

    শোলার বেড়া দেওয়া ঘরের একটা খাটের উপর লাল শাড়ী পরে বসে ছিল আমার বান্ধবী রুমকি।রুমকিকে পুতুলে মত ছোট্টটি মনে হচ্ছিল।আমাদেরকে দেখে সে হাউমাউ করে কেদে ফেললো।ওর কান্না দেখে আমিও কেদে ফেললাম।শুধু কাদলোনা সারা।স্বর্ণকিশোরী সারা কঠোর মনে  দমে গেল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনার জন্য।তার পর রুমকির সাথে কথা হলো কবে বিয়ে ছেলে কে বয়স কত কি করে নানা বিষয়ে।ছেলের বয়স ৪২ বছর। আগের স্ত্রী মারা যাওয়ায় নতুন করে বিয়ে করছে।আর আমাদের রুমকির বয়স সবে মাত্র ১৫ বছর।আমি রুমকিকে শান্তনা দিতে পারিনি।যা বলার সারা বলেছে।তার পর আমরা আর বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি সারা আমাকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে।আমি যখন কোন কিছুই ভাবতে পারছিনা তখন সারা বললো চল কাজ আছে এখানে বসে থেকে কিছু করা যাবে না।আমি তখনো জানতাম না সারা ঠিক কি কাজের কথা বলছে।আমাকে নিয়ে ও সোজা ফারিহার সাথে দেখা করতে গেল।ফারিহা ইসলাম তিফলা আরেকজন স্বর্ণকিশোরী।বাল্যবিবাহ রোধ কল্পে সে প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে।তিফলা সব কিছু শুনে সাথে সাথে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করলো এবং উপজেলা নিবার্হী অফিসার মুনতাসির সিয়াম সাহেবকে অবহিত করলো।তিনি সাথে সাথে পুলিশকে নির্দেশ দিলেন এই বিয়েটা বন্ধ করতেই হবে।

    তার পর পুলিশের জীপে করে স্বর্ণকিশোরী সারা আর স্বর্ণকিশোরী ফারিহা ইসলাম তিফলার সাথে আমিও রওনা হলাম রুমকিদের বাড়িতে।পুলিশ সহ আমরা যখন রুমকির বাড়িতে পৌছালাম তখন বরপক্ষ চলে এসেছে।ম্যাজিষ্ট্রেট গিয়ে সেই বিয়েটা বন্ধ করলো।তিফলা তখন পরিবারের সবাইকে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে বললো এবং সচেতন করলো।তখন সবাই তাদের ভুল বুঝতে পারলো।সব থেকে বেশি খুশি হলো আমার বান্ধবী রুমকি।সে তিফলাকে জড়িয়ে ধরে বললো আপু তুমি না থাকলে আমার যে কি হতো। আমার সব স্বপ্ন অপুরণীয় থেকে যেতো।তিফলা ওকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললো আমার চেয়ে তোমার বান্ধবীরাই বেশি করেছে।ওরা যদি আমাকে না জানাতো তাহলে আমিওতো কিছু করতে পারতাম না।এর পর রুমকি পড়াশোনায় মন দিলো।আর কদিন বাদেই আমাদের এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবে।আমরা জানি রুমকি সেরা হবে।সেদিন যদি রুমকির বিয়ে হয়ে যেত তাহলে একটি বাল্যবিবাহের কবলে পড়ে রুমকি নামের মেয়েটিকে আমরা হারিয়ে ফেলতাম।

    লেখকঃ সুমাইয়া মিফরা

    এটি একটি কল্পিত গল্প হলেও এমনই অসংখ্য বাল্যবিবাহের কবলে পড়ে কত কিশোরীর জীবন নষ্ট হচ্ছে তার কোন হিসেব আমাদের হাতে নেই।আর স্বর্ণকিশোরীরা সত্যি সত্যিই প্রতিনিয়ত দেশের নানা প্রান্তে বাল্যবিবাহ রোধ করছে ঠেকিয়ে দিচ্ছে।এমনকি শারমিনতো নিজেই নিজের বিয়েটা ভেঙ্গে দিয়েছিল।

    বাল্যবিবাহ রোধ করি ,
    কৌশর বান্ধব বাংলাদেশ গড়ি”

    কবি গুরু রবী ঠাকুরের নামকরণকৃত ঝালকাঠি সদর উপজেলার সনামধন্য উদ্ধোধন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কিশোর কিশোরী সুরক্ষা ক্লাব‌ গঠন করেছে স্বর্ণকিশোর সারা ও তার দল।ওরা চায় সকল কিশোর কিশোরীদের ওরা সচেতন করবে। একটি সুন্দর দেশ গড়ে তোলার জন্য ওরা পণ করেছে।ওদের সেই পণকে সবার সাথে শেয়ার করার দায়িত্বটুকু নিয়েছে ছোটদেরবন্ধু।পৃথিবীর প্রতিটি শিশু কিশোর কিশোরী নিরাপদ হোক এবং তাদের অধিকার ফিরে পাক সেই প্রত্যাশাই ব্যক্ত করছে ছোটদেরবন্ধু।সেই সাথে সবার কাছে আবদার করছে আপনিও লিখুন শিশু কিশোর কিশোরীদের অধিকার নিয়ে।


    আরও পড়ুনঃ