একটা সময় ছিল, শিশুরা বিকেল নামলেই দৌড়ে বেরিয়ে যেত—পাড়া, মাঠ, খোলা আকাশ। পড়ে গেলে নিজেরাই উঠে দাঁড়াত, ঝগড়া হলে নিজেরাই মিটমাট করত। আজকের শিশুরা? বেশিরভাগ সময় চোখে পড়ে মোবাইল স্ক্রিনে বন্দি, কিংবা বাবা–মায়ের কড়া নজরদারির ভেতরে।
প্রশ্নটা তাই খুব স্বাভাবিক—
আমরা কি প্যারেন্টিং করছি, নাকি অজান্তেই ওভারপ্যারেন্টিংয়ে ঢুকে পড়েছি?
ওভারপ্যারেন্টিং কী?
ওভারপ্যারেন্টিং মানে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত সুরক্ষা এবং সন্তানের প্রতিটি সিদ্ধান্তে বাবা–মায়ের হস্তক্ষেপ।
ভালোবাসা থেকে শুরু হলেও, ধীরে ধীরে এটি শিশুর স্বাধীনতা, আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সহজভাবে বললে—
“আমি তোমার ভালোই চাই”—এই বাক্যটি যখন সন্তানের সব সিদ্ধান্ত কেড়ে নেয়, তখন সেটাই ওভারপ্যারেন্টিং।
কেন বাবা–মা অতিরিক্ত হয়ে যান?
এর পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ আছে—
- ভয়:
পৃথিবীটা আগের চেয়ে বেশি অনিরাপদ—এই বিশ্বাস। - প্রতিযোগিতা:
পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, “অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে পড়বে না তো?”—এই চাপ। - নিজের অপূর্ণতা:
বাবা–মায়ের নিজের না-পাওয়া স্বপ্ন সন্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া। - সোশ্যাল মিডিয়া প্রভাব:
“পারফেক্ট প্যারেন্ট” হওয়ার এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা।
ওভারপ্যারেন্টিংয়ের কিছু লক্ষণ
নিজেকে প্রশ্ন করুন—
- সন্তানের ছোটখাটো ভুলও কি আপনি সহ্য করতে পারেন না?
- সে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে কি আপনি অস্বস্তি বোধ করেন?
- পড়াশোনা, বন্ধুত্ব, শখ—সবকিছুতেই কি আপনার নির্দেশনা বাধ্যতামূলক?
- সন্তানের হয়ে কি আপনি প্রায়ই কথা বলেন, সমস্যার সমাধান করে দেন?
যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে।
এর প্রভাব কোথায় গিয়ে পড়ে?
গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত শিশুরা—
- সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায়
- ব্যর্থতা সহ্য করতে শেখে না
- আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি তৈরি হয়
- বড় হয়ে উদ্বেগ (anxiety) ও নির্ভরশীলতায় ভোগে
অর্থাৎ, ছোটবেলায় “সুরক্ষিত” থাকলেও, বাস্তব জীবনে তারা অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ে।
তাহলে কি ছেড়ে দিতে হবে সব?
না, একদমই না।
প্যারেন্টিং মানে ছেড়ে দেওয়া নয়,
প্যারেন্টিং মানে পাশে থাকা—কিন্তু ছায়া হয়ে দাঁড়ানো নয়।
ভালো প্যারেন্টিংয়ের কয়েকটি চর্চা হতে পারে—
- ভুল করতে দেওয়া, কিন্তু পাশে থাকা
- সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহ দেওয়া
- সব সমস্যার সমাধান করে না দিয়ে ভাবতে শেখানো
- “তুমি পারবে”—এই বিশ্বাসটা তৈরি করা
সন্তান আপনার নয়—
সে একজন স্বাধীন মানুষ, যার নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার অধিকার আছে।
ভালোবাসা আর নিয়ন্ত্রণের মাঝের সূক্ষ্ম রেখাটা চিনতে পারলেই প্যারেন্টিং সুন্দর হয়।
নইলে অজান্তেই ভালোবাসা হয়ে ওঠে এক ধরনের শৃঙ্খল।
আজ একটু থেমে নিজেকে জিজ্ঞেস করাই যাক—
আমি কি সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ছি, নাকি তার জায়গায় দাঁড়িয়ে বাঁচছি?
১. সন্তানের হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া
কী পড়বে, কী খেলবে, কার সঙ্গে মিশবে—সব আপনি ঠিক করে দিলে সন্তান নিজের পছন্দ-অপছন্দ বোঝার সুযোগ পাবে না। বড় হয়েও সিদ্ধান্তহীনতা আর আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগবে। ভালো-মন্দ নানা দিক বিশ্লেষণের ক্ষমতা কমে যাবে।
২. ছোট ছোট ভুলও হতে না দেওয়া
ভুলের মাধ্যমেই শিশু শেখে। প্রতিবার বাঁচিয়ে দিলে শেখার সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।
৩. সারাক্ষণ নজরদারি করা
সব সময় ফোন করা, খোঁজ নেওয়া বা পর্যবেক্ষণ করা সন্তানের মধ্যে নজরদারি থেকে পালানোর ঝোঁক তৈরি করতে পারে। তাতে আপনার আর সন্তানের ভেতর দূরত্ব তৈরি হবে। আর তখন সে যখনই চোখের আড়াল হবে বা সুযোগ পাবে, এমন কিছু করার চেষ্টা করবে, যা আপনি মোটেও করতে দিতে চান না বা যা আপনার থেকে লুকানো আবশ্যক।
৪. সমস্যা দেখলেই হস্তক্ষেপ করা
বন্ধু, শিক্ষক বা পরিস্থিতির সঙ্গে সামান্য সমস্যাতেই আপনি এগিয়ে গেলে সন্তান নিজে মোকাবিলা করতে শেখে না। পরবর্তী জীবনে জটিল সমস্যা ডেকে আনে।
৫. তুলনা
সন্তানের মনোবল ভেঙে দেয়। আর তার ভেতর হীনম্মন্যতা তৈরি করে।
মডেল: রোহান।
৬. বয়সের তুলনায় কম দায়িত্ব দেওয়া
বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব না পেলে আত্মনির্ভরতা গড়ে ওঠে না।
৭. সব ঝুঁকি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা
জীবন ঝুঁকিমুক্ত নয়। নিরাপদ ঝুঁকি নিতে না শেখালে সন্তান ভবিষ্যতে ভয় পেতে শেখে। সব ঝুঁকি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা সন্তানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
৮. নিজের ভয় সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া
আপনার ব্যক্তিগত ভয় বা বিশ্বাস যেন সন্তানের সিদ্ধান্ত ও স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণ না করে।

অনেক অভিভাবকের কারণে সন্তানের আত্মবিশ্বাস কমে যায়। মডেল: সাঝবাতী।
৯. ‘আমিই সব ভালো বুঝি’ মনোভাব
আপনি সব পারেন, সব উত্তর আপনার কাছেই আছে, আপনিই ভালো বোঝেন—এই ধারণায় সন্তানের কণ্ঠস্বর, আত্মবিশ্বাস চাপা পড়ে যায়।
১০. স্বাধীনতা দিতে ভয় পাওয়া
স্বাধীনতা মানেই দূরে সরে যাওয়া নয়, বরং আস্থা আর বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করা। সন্তানকে একটু একটু করে নিজের ওপর ভর করতে, আত্মনির্ভরশীল হতে শেখানোই স্বাধীনতা।
সূত্র: প্যারেন্টস
