ঈদ, জন্মদিন, পরীক্ষার ফলাফল কিংবা হঠাৎ কোনো আনন্দ—উপহার দেওয়া মানেই পরিবারের ভেতরে খুশির উপলক্ষ। কিন্তু এই উপহারই যদি সন্তানদের মাঝে বৈষম্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তা আনন্দের বদলে রেখে যায় গভীর ক্ষত।
অনেক সময় বাবা–মা বুঝতেই পারেন না—
একটা খেলনা, একটা মোবাইল, বা একটু বেশি দামি পোশাক—এসবের মধ্য দিয়েই তারা সন্তানদের মনে অসমতার বীজ বপন করে ফেলছেন।
পারিবারিক শান্তি ও সংহতির মূলে রয়েছে মা-বাবার ন্যায়বিচার। বিশেষ করে সন্তানদের আর্থিক বিষয়ে কোনো কিছু প্রদানের ক্ষেত্রে মা-বাবার ইনসাফ থাকা অত্যন্ত জরুরি।
অনেক সময় দেখা যায়, মা-বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় সন্তানদের মাঝে জমি বা সম্পদ বণ্টন করে দিতে চান। এক্ষেত্রে আমাদের সমাজে একটি সাধারণ প্রবণতা হলো উত্তরাধিকার বা মিরাসের নিয়মে ছেলেকে মেয়ের দ্বিগুণ দেওয়া। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে দান বা হেবার ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে ফকিহগণ আলোচনা করেছেন।
সন্তানদের মাঝে ইনসাফ না করা কেবল সন্তানদের মাঝে বিদ্বেষই সৃষ্টি করে না, বরং মা-বাবাকে কেয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে অপরাধী হিসেবে দাঁড় করাতে পারে।
বৈষম্যটা হয় কীভাবে?
বৈষম্য সব সময় সরাসরি হয় না। অনেক সময় তা খুব সূক্ষ্ম—
- “ও বড়, তাই ও বেশি পাবে”
- “ও বেশি মেধাবী, তাই ওকে ভালো উপহার দেওয়া স্বাভাবিক”
- “ও তো এমনিতেই বোঝে না”
- “তোমার তো আগেও একটা ছিল”
কথাগুলো যুক্তিসংগত মনে হলেও, একটি শিশুর মনে এগুলো তৈরি করে অবমূল্যায়নের অনুভূতি।
শিশু কী দেখে, কী বোঝে?
শিশুরা খুব তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক। তারা হিসাব করে—
- কে বেশি পাচ্ছে
- কে কম পাচ্ছে
- কাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে
আর এখান থেকেই জন্ম নেয়—
- হিংসা
- অভিমান
- আত্মসম্মানবোধে ফাটল
- ভাই–বোনের সম্পর্কে দূরত্ব
অনেক সময় এই ক্ষত বড় হয় নীরবে, প্রকাশ পায় অনেক পরে—আচরণে, সম্পর্কে, এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও।
“ন্যায্য” আর “সমান”—এক কি?
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
সব ক্ষেত্রে সমান উপহার দেওয়া সবসময় সম্ভব বা প্রয়োজনীয় নাও হতে পারে। বয়স, প্রয়োজন বা পরিস্থিতির ভিন্নতা থাকতেই পারে।
কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন—
- এক সন্তান বারবার বেশি গুরুত্ব পায়
- অন্যজন নিজেকে কম গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করে
ন্যায্যতা মানে শুধু দামের সমতা নয়,
ন্যায্যতা মানে সমান সম্মান ও ভালোবাসার অনুভূতি।
বাবা–মায়ের অজান্তে যে ক্ষতি হয়
বৈষম্যমূলক উপহার প্রদানের ফলে—
- সন্তান নিজের মূল্য নিয়ে সন্দেহে ভোগে
- পরিবারকে নিরাপদ জায়গা মনে করে না
- বাবা–মায়ের প্রতি আস্থা কমে যায়
- ভাই–বোনের সম্পর্ক প্রতিযোগিতামূলক ও বিষাক্ত হয়ে ওঠে
সবচেয়ে বড় কথা—
শিশুটি শেখে, ভালোবাসাও শর্তসাপেক্ষ।
কীভাবে এই অন্যায় এড়ানো যায়?
কিছু ছোট সচেতনতাই বড় পরিবর্তন আনতে পারে—
- উপহারের আগে সন্তানের অনুভূতি ভাবুন
- পার্থক্য থাকলে সেটার কারণ পরিষ্কার করে বলুন
- দামের চেয়ে ভাবনার গুরুত্ব দিন
- তুলনা এড়িয়ে চলুন
- নিশ্চিত করুন—কেউ যেন নিজেকে “কম প্রিয়” মনে না করে
সন্তানের কাছে উপহার শুধু বস্তু নয়,
এটা ভালোবাসার ভাষা।
সেই ভাষায় যদি বৈষম্য থাকে,
তবে তা শিশুর মনে আজীবনের প্রশ্ন রেখে যায়—
“আমি কি কম প্রিয়?”
ভালো প্যারেন্টিং মানে শুধু দেওয়া নয়,
ভালো প্যারেন্টিং মানে ন্যায্যভাবে দেওয়া।
দানের ক্ষেত্রে ছেলে–মেয়ে সমান
মা-বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় সন্তানদের যা কিছু দেন, পরিভাষায় তাকে ‘আতিয়্যাহ’ বা ‘হেবা’ (দান) বলা হয়। মিরাস বা উত্তরাধিকার কার্যকর হয় মানুষের মৃত্যুর পর। তাই জীবিত অবস্থায় সম্পদ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে মিরাসের নিয়ম (ছেলের দ্বিগুণ) চাপিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
অধিকাংশ ফকিহ মনে করেন, জীবিত অবস্থায় সন্তানদের কিছু দেওয়ার সময় ছেলে ও মেয়ের মাঝে পূর্ণ সমতা বজায় রাখা জরুরি।
যদি কোনো পিতা তাঁর ছেলেদের বেশি দেন এবং মেয়েদের কম দেন, আর মেয়েরা এতে অসন্তুষ্ট থাকে, তবে এটি এক প্রকার জুলুম হিসেবে গণ্য হবে। শরিয়ত এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।
সাহাবি নুমান ইবনে বশিরের ঘটনা
সন্তানদের মাঝে দানের ক্ষেত্রে বৈষম্য কতটা ভয়াবহ, তা একটি প্রসিদ্ধ হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়। হজরত নুমান ইবনে বশির (রা.) বলেন, “আমার পিতা (বশির) আমাকে তাঁর সম্পদের কিছু অংশ দান করেছিলেন। আমার মা (আমরাহ বিনতে রাওয়াহা) বললেন, ‘আমি ততক্ষণ পর্যন্ত সন্তুষ্ট হব না, যতক্ষণ না আপনি আল্লাহর রাসুলকে এর ওপর সাক্ষী রাখেন।’
এরপর আমার পিতা নবীজির কাছে গেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি তোমার সব সন্তানকে এভাবে দান করেছ?’ তিনি বললেন, ‘না।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মাঝে ইনসাফ কায়েম করো।’ এরপর আমার পিতা ফিরে আসলেন এবং সেই দানটি ফিরিয়ে নিলেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৮৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২৩)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছিলেন, “তাহলে আমাকে সাক্ষী রেখো না, কারণ আমি অন্যায়ের ওপর সাক্ষী হতে পারি না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২৩)
প্রখ্যাত শাফেয়ী ফকিহ ইবনে দাকিকুল ইদ এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, “এই হাদিসটি সন্তানদের মাঝে দানের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করার জোরালো প্রমাণ। এর রহস্য হলো, কাউকে কমবেশি দিলে সন্তানদের মাঝে পারস্পরিক ঘৃণা ও শত্রুতা তৈরি হয় এবং যাকে কম দেওয়া হলো তার মনে মা-বাবার প্রতি অবাধ্যতার জন্ম নিতে পারে।” (আহকামুল আহকাম শারহু উমদাতিল আহকাম, ২/১২৭, মাতবাআতুস সুন্নাহ আল-মুহাম্মাদিয়্যাহ, কায়রো)
ছেলে ও মেয়ের সমতা: ফকিহগণের মতামত
সন্তানদের মাঝে সমানভাবে বন্টন করার অর্থ কি ছেলে ও মেয়েকে সমান দেওয়া, নাকি মিরাসের মতো ছেলেকে মেয়ের দ্বিগুণ দেওয়া? এই প্রশ্নে ফকিহগণ দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছেন:
১. অধিকাংশ ফকিহ : তাঁদের মতে, দানের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে উভয়কে সমানভাবে দিতে হবে। তাঁদের যুক্তি হলো, হাদিসে ‘সন্তানদের মাঝে সমতা’র কথা বলা হয়েছে, যেখানে ছেলে ও মেয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, নবীজি বলেছেন, “তোমরা তোমাদের সন্তানদের মাঝে দানের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করো। আর আমি যদি কাউকে অগ্রাধিকার দিতাম, তবে নারীদেরই দিতাম।” (বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস: ১২৫০০)
২. হাম্বলি মাজহাব ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.): তাঁদের মতে, দানের ক্ষেত্রেও মিরাসের নিয়ম অনুসরণ করা হবে; অর্থাৎ ছেলেকে মেয়ের দ্বিগুণ দিতে হবে। তাঁদের যুক্তি হলো—আল্লাহ তাআলা মিরাসের ক্ষেত্রে এই বণ্টন পদ্ধতি পছন্দ করেছেন, সুতরাং দান বা হেবার ক্ষেত্রেও এটিই ইনসাফ। (ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, ৫/৬৬৬, মাকতাবাতুল কাহেরা, ১৯৬৮)
তবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এবং পারিবারিক কলহ নিরসনে জমহুর ফকিহগণের মত অর্থাৎ ছেলে ও মেয়েকে সমানভাবে প্রদান করাকেই অধিকতর নিরাপদ ও ইনসাফপূর্ণ মনে করা হয়।
কখন কমবেশি দেওয়া বৈধ
যদি কোনো বিশেষ প্রয়োজন থাকে, তবে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে কোনো নির্দিষ্ট সন্তানকে কিছু বেশি দেওয়া যেতে পারে। যেমন:
- সন্তান যদি ইসলামি জ্ঞান অর্জনে মগ্ন থাকে, তাকে উৎসাহিত করার জন্য।
- কোনো সন্তান যদি অত্যন্ত অভাবগ্রস্ত হয় বা অনেক বেশি সন্তান-সন্ততি নিয়ে কষ্টে থাকে।
- কোনো সন্তান যদি শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ বা পঙ্গু হয়।
- কোনো সন্তান যদি অত্যন্ত নেককার ও পরহেজগার হয়, পক্ষান্তরে অন্য সন্তান যদি ফাসেক বা পাপাচারী হয়।
এই ধরনের সুনির্দিষ্ট কারণ থাকলে কিছুটা কমবেশি করা জায়েজ হতে পারে, তবে তা যেন অন্য সন্তানদের প্রতি অবজ্ঞা বা তাদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে না হয়। (আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ১১/৩৫০)
সন্তানরা হলো মা-বাবার কাছে আল্লাহর আমানত। মা-বাবার সামান্য বৈষম্যমূলক আচরণ একটি সুখী পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে। বিশেষ করে কন্যা সন্তানদের তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা বা তুচ্ছ জ্ঞান করা জাহেলি যুগের স্বভাব।
পবিত্র কোরআন–সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী, মা-বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় যদি সম্পদ দান করতে চান, তবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ইনসাফ বজায় রাখা উচিত।
