শিশুরা কীভাবে বেশি স্মার্ট হয়? শিশুর বয়স পাঁচ-ছয় মাস। মিষ্টি হাসতে শিখেছে। মা কাছে এলে আরও খুশি হয়। এখন আপনি ভাবছেন ঘুমের সময় ছড়া শোনাবেন। আরও একটু বড় হলে শোনাবেন বই পড়ে। কারণ, এখন তো বইয়ের ভাষা বুঝবে না। আমরা সাধারণত এ রকমই ভাবি। কিন্তু আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের গৃহীত নীতিনির্ধারণী অবস্থানে বলা হয়েছে, জন্মের পর থেকেই পড়াশোনার বিষয়টি প্রাথমিক শিশু পরিচর্যার অংশ হওয়া উচিত। এর অর্থ, খুব ছোট বাচ্চাদেরও বই পড়ে শোনানোর গুরুত্ব সম্পর্কে মা-বাবাদের সচেতন করা শিশু চিকিৎসাবিদদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। আমাদের দেশে এ রকম চর্চা খুব একটা নেই। কিন্তু এটা অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে এলে আমাদের শিশুরা উপকার পাবে। তারা স্মার্ট ও বুদ্ধিদীপ্ত হবে। বিস্তৃত পরিসরে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, বইয়ের সংস্পর্শে ও বই পড়ে শোনানোর মধ্য দিয়ে বড় করে তোলা শিশুদের সঙ্গে পরে তাদের সহজে ভাষা শেখা ও স্কুলে সাফল্যের সংযোগ রয়েছে।

পেডিয়াট্রিক্স জার্নালে ২০১৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে জানা গেছে, যেসব শিশুর বাসায় বেশি বই আছে এবং শিশুকে বেশি বই পড়ে শোনানো হয়, তাদের মস্তিষ্কের বাঁ অংশ উল্লেখযোগ্য হারে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পেরিয়েটাল-টেম্পোরাল-অক্সিপেটাল অ্যাসোসিয়েশন করটেক্স নামে পরিচিত মস্তিষ্কের এই অংশে শব্দ ও চোখে দেখার অনুভূতির সংমিশ্রণ ঘটে। একটু বড় শিশুরা জোরে শব্দ করে পড়লে মস্তিষ্কের এই অংশ উদ্দীপিত হয়।

শিশুচিকিৎসাবিদেরা খেয়াল করেছেন, খুব ছোট বাচ্চাদের বইয়ের গল্প পড়ে শোনালেও একইভাবে মস্তিষ্কের এই অংশ উদ্দীপিত হয়। মায়ের মুখে গল্প শোনার সময় বাচ্চারা মনে মনে কল্পনার জাল বোনে। যেমন, মা বললেন, ‘একটা কাক গাছের ডালে বসে কা-কা করছে।’ সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চা তার একটা চিত্র এঁকে ফেলল। এভাবে কথার সঙ্গে কল্পনার একটা যোগসূত্র স্থাপনের দক্ষতা সে অর্জন করে। আমরা যখন শিশুকে গল্প পড়ে না শুনিয়ে শুধু ভিডিও দেখাই, তখন শেখার প্রক্রিয়াটা আসলে শর্টসার্কিটের শিকার হয়ে নষ্ট হয়। শিশুকে বঞ্চিত করা হয় কল্পনার সুযোগ থেকে। এটা মনে রাখতে হবে। বইয়ের গল্পে অনেক বেশি ও নতুন নতুন শব্দ থাকে। তাই বই থেকে গল্প পড়ে শোনালে বাচ্চাদের শব্দভান্ডার বাড়ে ও কল্পনাশক্তি অনেক বেশি হয়। এরা স্কুলে বেশি মেধার পরিচয় দেয়।
লেখক: আব্দুল কাইয়ুম, সম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা।

শিশুরা জন্মগত সক্ষমতা + পরিবেশ + অভ্যাস—এই তিনটির সমন্বয়ে বেশি স্মার্ট হয়ে ওঠে।
🧠 ১. সঠিক পুষ্টি
শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে দরকার—
- প্রোটিন: ডিম, মাছ, দুধ, ডাল
- ওমেগা–৩ (DHA): সামুদ্রিক মাছ
- আয়রন ও আয়োডিন: শাকসবজি, লবণ
- ফল ও শাকসবজি: অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের জন্য
👉 অপুষ্টি হলে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ কমে যায়।

👶 ২. ছোটবেলা থেকেই কথা বলা ও পড়া
- শিশুর সঙ্গে বেশি কথা বলুন
- গল্প পড়ুন, ছড়া বলুন
- প্রশ্ন করলে ধৈর্য ধরে উত্তর দিন
👉 এতে ভাষা, চিন্তা ও কল্পনাশক্তি বাড়ে।
🎨 ৩. খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজ
- খোলা জায়গায় খেলাধুলা
- আঁকা, রং করা, গান, নাচ
- ব্লক, পাজল, লেগো
👉 খেলাই শিশুর সবচেয়ে বড় শেখার মাধ্যম।

📱 ৪. স্ক্রিন টাইম সীমিত করা
- ২ বছরের নিচে: স্ক্রিন নয়
- ২–৫ বছর: দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা
- মোবাইলের বদলে বাস্তব খেলনা ও মানুষের সাথে যোগাযোগ
👉 অতিরিক্ত স্ক্রিন মনোযোগ ও ভাষা বিকাশে ক্ষতি করে।
😴 ৫. পর্যাপ্ত ঘুম
- বয়সভেদে ৮–১২ ঘণ্টা ঘুম
- রাতে দেরি করে জাগানো ঠিক নয়
👉 ঘুমের সময়ই স্মৃতি গুছিয়ে নেয় মস্তিষ্ক।
❤️ ৬. নিরাপদ ও ভালোবাসার পরিবেশ
- মারধর নয়, ভয় দেখানো নয়
- উৎসাহ দিন, তুলনা করবেন না
- ভুল করলে শেখার সুযোগ দিন
👉 নিরাপত্তা পেলে শিশুর আত্মবিশ্বাস ও বুদ্ধি বাড়ে।
📚 ৭. কৌতূহলকে উৎসাহ দিন
- “কেন?” প্রশ্ন করতে দিন
- নিজে নিজে চেষ্টা করতে দিন
- সব কিছু করে না দিয়ে পথ দেখান
👉 কৌতূহলই স্মার্ট হওয়ার মূল চাবিকাঠি।
⚠️ মনে রাখবেন
স্মার্ট মানে শুধু ভালো রেজাল্ট নয়—
✔️ ভাবতে পারা
✔️ সমস্যা সমাধান
✔️ আবেগ বোঝা
✔️ নিজেকে প্রকাশ করতে পারা
