টিকা অব্যবস্থাপনার বলি শিশুরা

0
5

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এক বছরের কম বয়সী শিশুরা এতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা, টিকাদান কর্মসূচিতে ছেদ পড়া এবং সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে আসা প্রায় দুই কোটি এমআর (মিজেলস-রুবেলা) টিকা সরকারের হাতে জমা থাকলেও লোকবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে তা শিশুদের মধ্যে প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।

এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্বাস্থ্য খাতের সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ হয়ে যায়। পরে ওই বছরের ডিসেম্বরে রাজস্ব খাত থেকে অর্থ নিয়ে এমআর টিকা কেনা হয়, যা ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সরবরাহ ছিল। এরপর দীর্ঘ সময় টিকার সরবরাহ বন্ধ থাকে।

এই পরিস্থিতিতে প্রায় ৯ মাস ধরে শিশুরা নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী অনেক শিশু হাম ও রুবেলার মতো সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা পায়নি। এমনকি দেড় বছর বয়সী অনেক শিশুর টিকার দুই ডোজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

দেশে সরকারি পর্যায়ে ১৯৮৮ সালে শুরু হয় এমআর টিকাদান কার্যক্রম। এরপর ধারাবাহিকভাবে শিশুদের এ টিকাদান কার্যক্রম চলে আসছে।

শিশুদের সাধারণত ৯ মাস পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ এমআর টিকা দিতে হয়।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, “টিকার জন্য গঠিত বৈশ্বিক জোট ‘গ্যাভি’ গত মাসে বাংলাদেশে দুই কোটি ডোজ এমআর টিকা পাঠিয়েছে। কিন্তু টিকা দেওয়ার জন্য জনবল নিয়োগ, তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক (যেমন—সিরিঞ্জ) এবং প্রয়োজনীয় ফান্ডের অভাব রয়েছে। যে কারণে টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমরা এ বিষয়ে ‘গ্যাভি’ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি কোনো বড় সংকট না থাকলেও বাজেটকাঠামো বা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) থেকে অর্থ রেভিনিউ খাতে যাওয়ার প্রক্রিয়ার সময় সমন্বয়হীনতার কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। তবে এই সময়ে ঘাটতি মেটাতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত টিকা এবং আসন্ন ক্যাম্পেইনের জন্য বরাদ্দ করা দুই কোটি টিকা ব্যবহারের পরিকল্পনা করছি। আশা করছি দ্রুত এ সমস্যার সমাধানে গ্যাভির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ও ফান্ড পাওয়া যাবে।’

এদিকে বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে টিকার জন্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ঘটনায় তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত বলেও জানান।  স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গত ১১ দিনে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৩৩টি শিশু মারা গেছে। এর মূল কারণ ছিল ভেন্টিলেটরের অভাব বা যান্ত্রিক ত্রুটি। আমি এবং আমার সচিব, প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি আগে জানতে না পারায় অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করছি।’

১২ জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব : বিভিন্ন জেলার কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য মতে, এ পর্যন্ত দেশের ১২টি জেলায় রোগটির প্রাদুর্ভাবের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোর জেলায় বেশি হামের রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এর বাইরে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজিপুর, ভোলা ও পটুয়াখালী জেলার রোগীদের রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘গত সপ্তাহে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহীতে ৪৫০ জন শনাক্ত হয়েছিল বলে শুনেছিলাম। এর বাইরে অন্য কোনো জেলার কথা শুনিনি।’

তবে তথ্য বলছে, রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলতি বছর প্রায় ৫০০ শিশু হাম নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে ১৯ শিশু মারা গেছে। হাসপাতালটির সেবা তত্ত্বাবধায়ক ডা. তানজিনা জাহান কালের কণ্ঠকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দিন দিন বাড়ছে হাম আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা। চলতি মাসে এই রোগে আক্রান্ত ১০৬ জন ভর্তি হয়েছে; তাদের মধ্যে পাঁচ শিশু মারা গেছে। এ ছাড়া চলতি মাসে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হাম নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ১২ শিশুর মারা গেছে। এ পর্যন্ত আক্রান্ত ভর্তি রোগী শতাধিক।

টিকাদান কর্মসূচিতে ছেদ পড়া প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ : সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ টিকাদান কর্মসূচিতে ছেদ পড়া। অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই থেকে বাদ পড়ে যাওয়ায় তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। এ ছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং অপুষ্টির কারণেও ভাইরাসের বিস্তার দ্রুত ঘটেছে। টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ ডোজ নেওয়ার ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠী ঝুঁকির মুখে পড়াই প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (গ্যাভি) সিএসও কনস্টিটিউয়েন্সি স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারপারসন ড. নিজাম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশে একাধিক টিকার সংকট রয়েছে, যার মধ্যে হামের টিকা অন্যতম। এর ফলে যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি তারাই বেশি হামে আক্রান্ত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে ইপিআইয়ের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন সময় ভ্যাকসিনের সরবরাহ ছিল না, আবার কর্মীদের আন্দোলনের কারণে মাঠ পর্যায়ে ঠিকমতো টিকা দেওয়া যায়নি। ফলে বহু শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ ছাড়া ইপিআই কর্মসূচিতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পদ শূন্য থাকাও টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আরেকটি অন্যতম কারণ।’

Previous articleশিশুর স্বাভাবিক বিকাশ কিভাবে হয়?
ছোটদেরবন্ধু শিশু অধিকারের মুখপাত্র। সমাজের বঞ্চিত, অসহায়,নিপীড়িত শিশু কিশোর কিশোরীদের কথা বলে। এছাড়াও শিশুদের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে সহযোগিতা করে। শিশু কিশোর কিশোরীদের কল্যাণমূলক কাজ করে থাকে। বিনয়ের সাথে আমরা বলতে পারি একক ভাবে শিশু কিশোর কিশোরীদের বিষয়ে ছোটদেরবন্ধুর চেয়ে সমৃদ্ধ কোনো ওয়েবসাইট গোটা পৃথিবীতে আছে কি না সন্দেহ। এটি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। আপনি এই আয়োজনে একজন আর্থিক সহযোগী হতে পারেন। আবার কেউ চাইলে বিজ্ঞাপন দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন। যোগাযোগ: ০১৮৯২৭০০৭৯৩ (হোয়াটসঅ্যাপ) ইমেইল: [email protected]