শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য হলে কী করবেন?

প্রায়ই শিশুদের নিয়মিত পায়খানা হয় না। অথবা হলেও শক্ত বা কঠিন হওয়ার কারণে কষ্ট পায় শিশু। সাধারণত দুই থেকে তিন বছরের শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্য বেশি হয়। শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্যর প্রধান কারণ নতুন শেখা টয়লেটের অভ্যাস অথবা খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। আবার অতিরিক্ত মানসিক চাপ (নতুন পরিবেশ, পরিবারে নতুন শিশুর আগমন, স্কুলে প্রথম ভর্তি হওয়ার কারণে), থাইরয়েড হরমোনের সমস্যা বা জন্মগত কিছু রোগেও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই সমস্যা সাময়িক।

0
102
সম্পাদক

বাচ্চাদের কোষ্ঠকাঠিন্য হলে খুব কান্নাকাটি করে, পেট মোচড়ায় এবং খাওয়া-দাওয়াও কমিয়ে ফেলে। অস্বস্তিবোধ হয় বলেই এমনটা করে তারা। শিশুর এই অস্বস্তিবোধ পরিবারকেও অস্বস্তি করে তোলে। বাচ্চার যে শুধুমাত্র অনিয়মিত মলত্যাগ না করলেই কোষ্ঠকাঠিন্য হবে তা নয়। বরং অনেক বাচ্চা রোজই মলত্যাগ করছে অথচ তা স্বাভাবিক নয়, প্রকৃতপক্ষে একেই কোষ্ঠকাঠিন্য বলা হয়। তাই অনেক অভিভাবকই সন্তানের কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ বুঝতে দেরি করে ফেলেন। কিন্তু তাতে শিশুর কষ্ট বাড়তেই থাকে। তাই আপনার সন্তানের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা নজরে এলেই দেরি না করে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

যে বয়স থেকে শুরু হয়

সাধারণত দেড়-দু বছরের মধ্যে শিশুরা স্বাভাবিক খাবারে অভ্যস্ত হতে শুরু করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তখন থেকেই শুরু হয় কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা। তিন থেকে পাঁচ বছরের শিশুরা এই সমস্যায় বেশি ভোগে। তবে সময়মতো চিকিৎসা না করলে দশ বছর পর্যন্ত কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা চলতে থাকে। বাচ্চারা মাতৃদুগ্ধ খাওয়া যখন থেকে কমিয়ে দেয়, তখনই কোষ্ঠকাঠিন্য হতে বেশি দেখা যায়। অনেক বাচ্চা মাতৃদুগ্ধ পানের সময়ও নিয়মিত মলত্যাগ করে না, কিন্তু তাকে কোষ্ঠকাঠিন্য বলা হয় না। কারণ সেই সময় বাচ্চা নিয়মিত মলত্যাগ না করলেও যখনই মলত্যাগ করে তা স্বাভাবিকই হয়। আর ডাক্তারি পরিভাষায় কোষ্ঠকাঠিন্য হল শক্ত মল নির্গত হওয়া, কতদিন বাদে বাদে শিশু মলত্যাগ করছে তা নয়। অর্থাৎ যদি কেউ রোজই দু-তিনবার মলত্যাগ করে কিন্তু তা স্বাভাবিকের থেকে শক্ত হয় তাহলে তাকে কোষ্ঠকাঠিন্যের আওতায় ফেলা হয়।

বেশিরভাগ কেন হয়

যত দিন যাচ্ছে, বাচ্চাদের রিফাইন্ড ফুড বা পরিশোধিত খাবার বেশি খাওয়ানোর জন্য কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বেড়েই চলেছে। ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার ও পানি কম খেলে কিংবা প্যাকেটের দুধ বেশি খেলেও কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। এছাড়াও কোনও কারণে একবার কোষ্ঠকাঠিন্যে মল ত্যাগ করতে কষ্ট হলে বাচ্চারা অনেক সময় পরে মল ত্যাগের বেগ এলে মলদ্বারে যন্ত্রণা হওয়ার ভয়ে চেপে দেয়। আর তারা যত মল নির্গত হওয়া চাপতে থাকে ততই কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়তে থাকে। অন্যদিকে, বাচ্চাদের যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা কম থাকে এবং পেটের পেশীর জোর কম থাকে বলে কোষ্ঠকাঠিন্যে শিশুদের অনেক বেশি কষ্ট হয়।

চিকিৎসা

অবশ্যই ডায়েটের দিকে নজর দিতে হবে। বেশি ফাইবারযুক্ত খাবার অর্থাৎ শাক-সবজি, ফল রোজকার খাদ্যতালিকায় অবশ্যই রাখতে হবে। কারণ আঁশ হল খাবারের সেই অংশ, যা পরিপাক হয় না এবং খাদ্যগ্রহণের পর অবশেষ হিসাবে মল তৈরি করে। খাদ্যের আঁশ অংশটুকু হজম না হওয়ার কারণে এগুলো পরিপাকতন্ত্রের বেশ কিছু জলীয় অংশ শোষণ করে ধরে রাখে এবং এই জলীয় অংশসহ ফাইবার মলের সঙ্গে বের হয়ে আসে। এই কারণেই ফাইবারযুক্ত খাবার খেলে মল নরম হয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ হয়। তবে প্রাণীজ প্রোটিন একেবারে বন্ধ করে দিলে চলবে না। বাজার চলতি প্যাকেটের দুধ কম খাওয়াতে হবে। ঘরে পাতা দই খেলেও তাও অল্প পরিমাণে খেতে হবে।

বাবা-মায়েদের জন্য টিপস

১) বাচ্চাদের বেশি করে আঁশযুক্ত খাবার অর্থাৎ শাক-সবজি বেশি খাওয়ান। সবজির মধ্যে ঢেঁড়শ, যে কোনও শাক, ডাঁটা, গাজর, পটল, বেগুন, শিম, কুমড়ো, লাউ ইত্যাদি অবশ্যই খাওয়ান। ফলের মধ্যে বেল, পেয়ারা, কালো জাম, কলা, অল্প পরিমাণে পাকা আম, খাওয়াতে পারেন। মটর, মুগ ও ছোলার ডালে যথেষ্ট পরিমাণে ফাইবার রয়েছে। শিশু একই সবজি রোজ রোজ খেতে না চাইলে পুষ্টির মান বজায় রেখে ভিন্ন স্বাদের রান্না করে খাওয়ান। যদি বাচ্চা একেবারে খেতে না চায় তাহলে ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নিন। পাশাপাশি ঘড়ি ধরে বার বার জল খাওয়াতে হবে। বেশি জল খেতে না চাইলে শরবত, ফ্রেশ ফলের রস কিংবা সবজির স্যুপ করে খাওয়ান।

২) সন্তানের যাতে রোজ মলত্যাগ করার অভ্যাস তৈরি হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাচ্চাকে বুঝিয়ে প্রাথমিক অবস্থাতেই গুরুত্ব দিয়ে সতর্ক হতে হবে। আজকাল বাচ্চারা অল্প বয়সেই প্লে স্কুলে ভর্তি হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে যদি সকালে স্কুলে যাওয়ার তাড়ায় বাচ্চার অভ্যাস তৈরি না হয়, তাহলে স্কুল থেকে ফিরে অর্থাৎ বিকেলেই অভ্যাস তৈরি করুন।

শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্য হলে যেসব সমস্যা হতে পারে:

• প্রতি সপ্তাহে তিনবার বা এর চেয়ে কম মলত্যাগ করা।
• শিশুর মল যদি অতিরিক্ত কঠিন হয়, তবে মলত্যাগের সময় কষ্ট হয়, কাঁদে।
• মলত্যাগের সময় ব্যথা পায়।
• মলের সঙ্গে রক্তপাত হতে পারে।
• পেটে ব্যথা থাকতে পারে।
• প্যান্টে সামান্য মল লেগে থাকতে পারে।
• যেহেতু মলত্যাগ করতে কষ্ট হয়, এ জন্য তার মলত্যাগে অনীহা বা আতঙ্ক দেখা দিতে পারে।
• কখনো কখনো বাচ্চাকে মলত্যাগের চেষ্টা করার সময় দুই পা ক্রস করা অবস্থায় অথবা বাচ্চার মুখ কুঁচকানো অবস্থায় দেখা যেতে পারে।
• কোষ্ঠকাঠিন্যর কারণে মলদ্বার ফেটে যেতে পারে। এতে মলদ্বারের পাশ দিয়ে চুলকানি হতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতও হতে পারে।
• দীর্ঘদিন নিয়মিত পায়খানা না করার কারণে মলত্যাগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অকার্যকর হয়ে অন্ত্রের জটিল রোগ হতে পারে।
• অরুচি দেখা দিতে পারে। এতে শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়, শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।

কী করবেন

১. শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তির জন্য তার খাদ্যাভ্যাসের কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন আঁশযুক্ত খাবার, ফল ও শাকসবজি বেশি খাওয়াতে হবে। প্রচুর পানি পান করাতে হবে।
২. যেসব খাবারে পায়খানা শক্ত হতে পারে (প্রক্রিয়াজাত খাবার, শুকনো ভাজাপোড়া), সেগুলো পরিহার করতে হবে।
৩. বাচ্চার মলত্যাগের নিয়মিত রুটিন ঠিক করতে হবে। প্রতিদিন একই সময়ে টয়লেট ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। প্রতিদিন খাবারের পরে অন্তত দুবার ১০ মিনিটের জন্য টয়লেটে বসার অভ্যাস করাতে হবে।
৪. কখনো কখনো চিকিৎসকের পরামর্শমতো মল নরম করার জন্য লাক্সাটিভ–জাতীয় ওষুধও খাওয়াতে হতে পারে।
৫. বাচ্চারা যাতে মানসিক চাপমুক্ত থাকে, এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে। স্কুলগুলোতে যেন নিয়মিত টয়লেট করার মতো পরিবেশ থাকে, সেটা খেয়াল রাখতে হবে।

কখন যাবেন ডাক্তারের কাছে

যদিও কোষ্ঠকাঠিন্য তেমন জটিল সমস্যা নয়, তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে—


• জ্বর
• খেতে না পারা
• পায়খানার সঙ্গে রক্তপাত
• পেট ফুলে যাওয়া
• বাচ্চার ওজন কমে যাওয়া
• পেটে তীব্র ব্যথা

লেখক: ডা. ফারাহ দোলা, বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর