শিশুদের যত্নে বাবা মায়ের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। শিশুদের ইমিউন সিস্টেম তুলনামূলক ভাবে কিছুটা দূর্বল হয়ে থাকে। এ সময়ে রোগ বালাইয় হতে পারে। ফলে ওদের প্রতি বেশি যত্নবান হতে হবে। শিশুদের টাইফয়েড টিকা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বিষয়ে জানুন এবং টিকা দিন। যেন আপনার শিশুটি সুস্থ থাকে, নিরাপদ থাকে।
🧒 টাইফয়েড কী?
টাইফয়েড জ্বরের কারণ Salmonella Typhi ব্যাকটেরিয়া।
এটি দূষিত পানি, খাবার ও অনিরাপদ স্যানিটেশনের মাধ্যমে ছড়ায়।
শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয় কারণ—
- ইমিউন সিস্টেম তুলনামূলক দুর্বল
- রাস্তার খাবার/অস্বাস্থ্যকর পানি সহজে গ্রহণ
- কম বয়সে হাইজিন অভ্যাস গড়ে ওঠেনি

💉 টাইফয়েড টিকার ধরন
১️⃣ Vi Polysaccharide (Vi-PS) Vaccine
- ২ বছর বয়সের পরে দেওয়া যায়
- কার্যকাল: প্রায় ৩ বছর
- বুস্টার দরকার: প্রতি ৩ বছরে
- বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রচলিত
২️⃣ Typhoid Conjugate Vaccine (TCV) – WHO Preferred
- ৬ মাস বয়স থেকে দেওয়া যায়
- শক্তিশালী ইমিউন প্রতিরোধ
- মাত্র ১ ডোজেই সুরক্ষা
- কার্যকাল: দীর্ঘ (৫+ বছর পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য)
- WHO এখন দেশগুলোকে এই টিকাই দিতে সুপারিশ করছে
🎯 শিশুদের কখন টিকা দেওয়া উচিত?
WHO–র সুপারিশ:
- ৬ মাস বয়স থেকে (TCV ভ্যাকসিন ব্যবহার হলে)
- Vi-PS ব্যবহার করলে ২ বছর বয়স থেকে
- টাইফয়েড প্রবণ দেশগুলোর শিশুদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (বাংলাদেশ — High burden country)
কারা অবশ্যই নেবে?
- ৬ মাসের বেশি বয়সী সব শিশু
- যাদের বারবার পেটে জ্বর হয়
- যাদের এলাকায় পানিবাহিত রোগ বেশি
- ডে-কেয়ার/স্কুলে যাতায়াতকারী শিশু
- যাদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল

💪 টাইফয়েড টিকার উপকারিতা
- টাইফয়েড জ্বরের সম্ভাবনা ৭০–৮৫% কমে (TCV)
- গুরুতর জটিলতা (আন্ত্রিক ছিদ্র, রক্তপাত, ডিহাইড্রেশন) প্রতিরোধ
- অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট টাইফয়েড থেকে সুরক্ষা
- বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া কমায়
- স্কুলে অনুপস্থিতি কমায়
⚠️ স্বাস্থ্যঝুঁকি / পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
সাধারণ, হালকা উপসর্গ (১–২ দিন):
- ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা/লালচে ভাব
- হালকা জ্বর
- মাথাব্যথা
- ক্লান্তি
- ছোটদের ক্ষেত্রে খিটখিটে ভাব
- মাঝে মাঝে বমি বমি ভাব
এগুলো স্বাভাবিক এবং ১–২ দিনের মধ্যে আপনি না দিলেও চলে যায়।
🚨 বিরল কিন্তু গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (Rare)
হেলথ রিস্ক খুব কম, তবে থাকতে পারে:
- অ্যালার্জি (Breathing difficulty, swelling, rash) – অত্যন্ত বিরল
- অতিরিক্ত জ্বর
- অস্বাভাবিক কান্না/খিটখিটে ভাব
এগুলো হলে দ্রুত চিকিৎসক দেখাতে হবে।
🔍 WHO ডেটা:
TCV এবং Vi-PS উভয়ই খুব নিরাপদ ভ্যাকসিন, গুরুতর প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত কম (<0.01%)।

❌ যেসব ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে টিকা দেবেন না
- শিশুর উচ্চ জ্বর থাকলে
- পূর্বে ভ্যাকসিনে অ্যালার্জি থাকলে
- কোনো গুরুতর রোগে আক্রান্ত থাকলে (ডাক্তারের পরামর্শ প্রয়োজন)
🧃 টিকা নেওয়ার পর কী করবেন?
- কিছুটা ব্যথা হলে ঠান্ডা সেঁক দিতে পারেন
- শিশুকে পানি/ওআরএস/জুস দিয়ে হাইড্রেট রাখুন
- ২৪ ঘণ্টা ভারি ব্যায়াম/দৌড়–ঝাঁপ না করা
- প্রয়োজনে প্যারাসিটামল দেওয়া যায় (ডাক্তারের ওজন অনুযায়ী ডোজ)

🏥 টিকা নেওয়ার পর কী দেখলে ডাক্তার দেখানো জরুরি?
- দীর্ঘসময় কান্না থামছে না
- শ্বাসকষ্ট
- অস্বাভাবিক র্যাশ
- ৩ দিনের বেশি উচ্চ জ্বর
- হাত-হাঁটু ফুলে যাওয়া
এগুলো খুবই কম হয়।

🔰 সারসংক্ষেপ
- টাইফয়েড শিশুদের জন্য বিপজ্জনক রোগ
- TCV ভ্যাকসিন এখন সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর
- ৬ মাস বয়স থেকে দেওয়া যায়
- পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই সামান্য
- গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি অত্যন্ত বিরল
- বাংলাদেশে শিশুদের জন্য টিকা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
দেশে প্রথমবারের মতো শিশুদের বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে টাইফয়েডের টিকা। এর আগে পাকিস্তান ও নেপালে শিশুদের এই টিকা দেওয়া হয়। নেপালে এই টিকার কার্যকারিতা নিয়ে ২০ হাজার শিশুর মধ্যে একটি গবেষণা চালায় বিশ্বখ্যাত মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ।
২০২১ সালে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, টিকাটি প্রথম বছরে ৮১ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছরে ৭৯ শতাংশ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। ‘টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন’ (টিসিভি) নামের এই টিকা ৯ মাস বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত সবার জন্য নিরাপদ। টিকা দেওয়ার পর সামান্য জ্বর বা ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা ছাড়া বড় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা যায়নি।
গবেষণায় দেখা গেছে, টাইফয়েড টিকা (টিসিভি) বাংলাদেশের শিশুদের জন্য ৮৫ শতাংশের বেশি সুরক্ষা দিতে পারে।
টাইফয়েড যা সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া শিশুদের শরীরে প্রবেশ করে এবং সংক্রমণের মাধ্যমে টাইফয়েড নামের তীব্র জ্বর সৃষ্টি করে। এটি সালমোনেলা প্যারাটাইফির কারণেও হতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

টাইফয়েডের সংক্রমণ শরীরের রক্ত সংবহন তন্ত্র এবং ভেতরের অঙ্গগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে; যা ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক বা অন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা যায়, তাহলে টাইফয়েড জটিলতা তৈরি করতে পারে। এতে মৃত্যুঝুঁকিও আছে।
টাইফয়েড জ্বর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে একটি বিরাট জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বন্যার সময় এর প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। প্রচণ্ড পেটব্যথা, তীব্র জ্বর যেখানে তাপমাত্রা ১০৩-১০৪ ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে, মাথাব্যথা, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য, চামড়ায় লালচে দানা দেখা দেওয়া, দুর্বলতা, প্রচণ্ড কাশি ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো শুরু টাইফয়েডের টিকা মাসব্যাপী চলেছে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত। দেশে টাইফয়েডের টিকার এটাই প্রথম ক্যাম্পেইন।
ডা. আয়শা আক্তার, উপপরিচালক, ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতাল, শ্যামলী, ঢাকা
আরও পড়ুন:
