শিশুর সুস্থতায় শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, শরীরের প্রতিটি অঙ্গে সুস্থ বিকাশ ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিচে সহজ ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হলো—
🌱 কেন শাকসবজি শিশুদের জন্য জরুরি?
১️⃣ শরীরের বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
শাকসবজিতে থাকে ভিটামিন A, C, K, ফলিক অ্যাসিড, লৌহ, ম্যাগনেশিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান, যা শিশুদের হাড়, দাঁত, চোখ ও ত্বককে সুস্থ রাখে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও শক্তিশালী করে।
২️⃣ হজমশক্তি উন্নত করে
বেশিরভাগ শাকসবজিতে থাকে খাদ্য আঁশ (ফাইবার), যা শিশুদের হজমে সহায়তা করে। কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় এবং পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
৩️⃣ মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়ক
সবুজ শাক যেমন পালং শাক, লাল শাক, কলমি শাক—এতে থাকা ফলেট ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শিশুর মস্তিষ্কের স্নায়ুবিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
৪️⃣ ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে
কম-ক্যালরিযুক্ত কিন্তু পুষ্টিগুণে ভরপুর হওয়ায় শাকসবজি শিশুর ওজন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত চর্বি জমতে দেয় না।
🥗 আঁশযুক্ত খাবারের গুরুত্ব
১️⃣ পেটের সমস্যা প্রতিরোধ করে
আঁশ হজমে সহায়তা করে, গ্যাস, অম্বল ও কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়।
২️⃣ রক্তে শর্করা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে
ধীরে হজম হওয়ায় রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়তে দেয় না। ফলে শিশুর শক্তি ধরে রাখে এবং অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগা কমায়।
৩️⃣ হার্ট সুস্থ রাখে
আঁশ রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে ভূমিকা রাখে, যা ভবিষ্যৎ হার্টের সুস্থতার জন্য উপকারী।
৪️⃣ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক
আঁশ অন্ত্রে ভালো ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এতে শিশুর ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী হয়।
🥦 শিশুর জন্য কোন কোন শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার ভালো?
- পালং শাক, লাল শাক, কলমি শাক
- গাজর, বিট, টমেটো
- কুমড়া, লাউ, পেঁপে
- মিষ্টি আলু
- শসা, বরবটি, করলা
- ফল: আপেল, পেয়ারা, কলা, কমলা
- ডাল, ওটস, চিড়া
- গম/আটা, ব্রাউন রাইস
🍽️ শিশুকে খাওয়ানোর সহজ টিপস
- শাকসবজি ভর্তা, স্যুপ, খিচুড়ির সাথে মিশিয়ে দিন।
- রঙিন সবজি (গাজর, বিট, ক্যাপসিকাম) দিয়ে খাবার আকর্ষণীয় করুন।
- রান্নায় অতিরিক্ত তেল, মসলা কম ব্যবহার করুন।
- শিশু যাতে বিরক্ত না হয়—এজন্য প্রতিদিন একই সবজি না দিয়ে একটু পরিবর্তন করে দিন।
✅ সংক্ষেপে
শিশুর সুস্থ শরীর, পরিষ্কার পেট, ভালো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও মানসিক বিকাশ—সবকিছুর পেছনে শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবারের বড় ভূমিকা আছে। তাই প্রতিদিনের খাবার তালিকায় নিয়ম করে বিভিন্ন রঙের শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার যুক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

চলুন এবার একজন বিশেষজ্ঞ ডক্টরের লেখা পড়ি-
আঁশযুক্ত খাবার মূলত অশোষিত শর্করা শ্রেণির। এর বেশির ভাগ আসে উদ্ভিদ থেকে যেমন—দানাদার শস্য, ফলমূল, শাকসবজি। এসব খাবার পরিপাকতন্ত্রে অপাচ্য হিসেবে থাকে। মল হিসেবে নির্গত হওয়ার আগে প্রায় ১০০ শতাংশ ক্ষেত্রে বৃহদন্ত্রে পৌঁছায়। যদিও আঁশজাত খাবার দেহে তেমন পরিমাণে ক্যালরি বিতরণ করে না, তবু যে কারও বিশেষ করে শিশুর সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে এর ভূমিকা বহুমুখী ও গুরুত্বপূর্ণ।
কেন আঁশযুক্ত খাবার দরকার
- বৃহদন্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়া এসব আঁশযুক্ত খাবারের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তৈরি করে প্রোবায়োটিকস, যা অন্ত্রে থাকা উপকারী জীবাণুগুলোকে পুষ্টি জোগায়।
- পরিপাকতন্ত্রে থাকা বিষাক্ত পদার্থ বা টক্সিন এবং ক্যানসার তৈরির উপাদান বিনষ্ট করে দেয়।
- মলের আয়তন ধরে রাখে। ফলে শিশুর কোষ্ঠবদ্ধতার নিরসন হয়।
- আঁশ পাকস্থলী থেকে খাবার অন্ত্রে যাওয়ার সময় বৃদ্ধি করে মানে পরিপাকতন্ত্রের চলনকে ধীর করে এবং এভাবে শিশুর খিদে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
- ফলমূল-শাকসবজি খাওয়া হলে শর্করাজাতীয় পানীয় পানের ফলে দেহে হঠাৎ করে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি কম থাকে।
- শিশুর দৈনন্দিন খাবারে আঁশযুক্ত ফলমূল, শাকসবজি বা দানাদার খাবার শিশু বয়সে ডায়াবেটিস, মুটিয়ে যাওয়া, রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, কোলন ক্যানসার ও আইবিডির মতো অন্ত্রের রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে উপকারী।
শিশু কতটুকু আঁশ খাবে
শিশুর খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন ন্যূনতম আঁশযুক্ত খাবারের পরিমাণ নির্ণয়ে নিম্নোক্ত ফর্মুলা ব্যবহার হয়। শিশুর বয়স (বছর) + ৫ = আঁশযুক্ত খাবারের পরিমাণ (গ্রাম হিসাবে)। যেমন—১ বছর বয়সের একটি শিশুর জন্য আঁশযুক্ত খাবারের পরিমাণ হবে: ১+৫ = ৬ গ্রাম/প্রতিদিন।
অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
