মা–বাবার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কখনো কখনো কিশোর কিশোরী সন্তান মিথ্যা বলতে শুরু করে। মা–বাবার জন্য এটি খুবই কষ্টদায়ক। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর কিশোরী বয়সে মিথ্যা বলা অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক একটি বিষয়। এই বয়সে ছেলেমেয়েরা নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা করে। এই পরিবর্তনের সময় সব পরিস্থিতিতে সত্য বলা তার পক্ষে সুবিধাজনক না-ও হতে পারে। অনেক সময় সৎ থাকলে স্বাধীনভাবে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই কিশোর সন্তানকে শুধু ‘মিথ্যা বলা যাবে না’ বলে ধমকালেই হবে না, বুঝতে হবে কেন মিথ্যা বলছে সন্তান, পেছনের কারণটাই কী।
নিচে মিথ্যা বলার পেছনে লুকিয়ে থাকা কিছু কারণ তুলে ধরা হলো—
কিশোর কিশোরীরা কেন মিথ্যা বলে?
সব মিথ্যার পেছনে খারাপ উদ্দেশ্য থাকে না। সাধারণ কিছু কারণ—
১. ভয়
ভুল করলে বকা, শাস্তি বা অপমানের ভয়।
২. বিচার হওয়ার আশঙ্কা
“তুমি এমন কেন?”—এই প্রশ্নটা কিশোরদের সবচেয়ে বেশি দূরে সরিয়ে দেয়।
৩. ব্যক্তিগত জায়গার অভাব
সব কিছু জানার চাপ কিশোরকে গোপনীয়তার দিকে ঠেলে দেয়।
৪. প্রত্যাশার বোঝা
ভালো ছাত্র, ভালো সন্তান, ভালো মানুষ—সব একসাথে হতে না পারার চাপ।
৫. নিয়ন্ত্রণ এড়ানোর চেষ্টা
অতিরিক্ত নিয়ম আর নজরদারি অনেক সময় মিথ্যার পথ খুলে দেয়।
মিথ্যা কি সবসময় সমস্যার লক্ষণ?
না।
কখনো কখনো ছোটখাটো মিথ্যা কিশোরের মানসিক বিকাশেরই অংশ।
কিন্তু চিন্তার কারণ হয় তখনই, যখন—
- মিথ্যা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়
- চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না
- অকারণে রাগ বা চুপচাপ হয়ে যায়
- আগের চেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়
এগুলো অনেক সময় ভেতরের চাপ, অপরাধবোধ বা মানসিক সংকেত হতে পারে।
অভিভাবক কী করলে পরিস্থিতি খারাপ হয়?
অনেক সময় না বুঝেই আমরা পরিস্থিতি আরও জটিল করি—
- জেরা করা
- তুলনা করা
- “তুমি তো এমনই” বলে লেবেল লাগানো
- বিশ্বাস ভাঙার কথা বারবার মনে করিয়ে দেওয়া
এসব আচরণ কিশোরকে সত্যের কাছাকাছি আনে না, বরং আরও দূরে ঠেলে দেয়।
তাহলে কী করা উচিত?
কিশোরকে সত্য বলাতে চাইলে আগে দরকার নিরাপদ পরিবেশ।
- শাস্তির আগে কথা শোনার অভ্যাস করুন
- ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ দিন
- সব প্রশ্নের উত্তর জোর করে আদায় করতে যাবেন না
- তাকে বুঝতে দিন—ভুল করলেও ভালোবাসা কমবে না
- নিজের আচরণে সততা দেখান (শিশুরা দেখে শেখে)
সবচেয়ে জরুরি—
বিশ্বাস ভাঙা নয়, বিশ্বাস গড়া।
কারণটা সাধারণত অবাধ্যতা নয়, ভয়
কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েরা সাধারণত শাস্তির ভয়ে মিথ্যা বলে। মা-বাবা তাদের সমর্থন করবেন না, এই ভয়েও তারা মিথ্যা বলে থাকে। এই বয়সী ছেলেমেয়েদের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ কম থাকে। কোনো কাজের পরিণতি সম্পর্কেও তাদের ধারণা স্পষ্ট নয়। তারা অনেক সময় ভাবে, সংঘাত কিংবা সমালোচনা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো মিথ্যা বলা। সন্তান মিথ্যা বলছে মানেই সে অবাধ্য, বিষয়টি এমন নয়। মা-বাবাকে বুঝতে হবে যে কিশোর সন্তান এখনো সত্য বলার জন্য নিজেকে মানসিকভাবে নিরাপদ মনে করছে না।
স্বাধীন হয়ে ওঠার একটি লক্ষণ
কিশোর বয়সীদের মিথ্যা বলা অনেক সময় তাদের স্বাধীন হওয়ার চেষ্টারই একটি বহিঃপ্রকাশ। কৈশোর এমন একটি সময়, যখন তারা নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। তারা একা থাকতে চায় এবং গোপনীয়তা রক্ষা করতে চায়।
মা–বাবা বিষয়টি বুঝতে পারলে খুব বেশি কড়াকড়ি আরোপ করা থেকে বিরত থাকতে পারেন। কারণ, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করলে সন্তান তার স্বাধীনতা ধরে রাখার জন্য মিথ্যার পথ বেছে নিতে পারে।
আত্মপরিচয় নিয়ে দ্বন্দ্ব
অন্যরা তাদের কীভাবে দেখছে, এ নিয়ে কিশোরদের চিন্তার শেষ নেই। অনেক সময় বন্ধুদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বা লজ্জাজনক পরিস্থিতি এড়াতে তারা মিথ্যা বলে।
তারা সাধারণত খুব ছোট ছোট বিষয় নিয়ে মিথ্যা বলে থাকে। যেমন, স্কুলের ফোন নম্বরটা মা-বাবাকে ভুল বলল। কোনো বন্ধুর সঙ্গে আসলে তার সম্পর্ক কতখানি গভীর, মা-বাবাকে সেটা বলল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলেও মা-বাবার কাছে স্বীকার করল না। এ রকম আরও অনেক কিছু। কিন্তু এর পেছনের আসল কারণ অনেক সময়ই একটাই—নিজেকে ‘খুব ভালো’ প্রমাণ করার চেষ্টা।
মা-বাবার প্রতিক্রিয়া দেখতে চাওয়া
কিশোরেরা অনেক সময় মিথ্যা বলে দেখতে চায়, কোন সম্ভাব্য ঘটনায় মা–বাবা বা অন্যরা কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। নিয়মগুলো কতটা শক্ত, শাস্তি হবে কি না—এসব তারা যাচাই করতে চায়।
মস্তিষ্কের বিকাশের এই সময়ে কিশোরদের আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও ধীরে ধীরে তৈরি হয়। তাই নিয়মকানুন আসলে কতটা কার্যকর, সেটা পরীক্ষা করা তাদের জন্য একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এমন পরিস্থিতিতে মা–বাবাকে শান্ত স্বরে কথা বলতে হবে, দৃঢ়তা বজায় রাখতে হবে। তাহলে কিশোরেরা বুঝতে শিখবে, মিথ্যা বা লুকোচুরির চেয়ে সত্যবাদিতা বেশি মূল্যবান।
মা–বাবা কী করতে পারেন
মা–বাবাকে খোলাখুলিভাবে সন্তানের সঙ্গে কথা বলতে হবে। রাগ না করে সন্তানের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। তাহলে সে বুঝতে পারবে, জীবনে সৎ থাকা কেন প্রয়োজন এবং কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আপনার কিশোর সন্তান যেন সততার গুরুত্ব বুঝতে পারে এবং তা গ্রহণ করতে পারে। তাহলে সে মিথ্যা আর সত্যের মধ্যে সব সময় সত্যকে বেছে নিতে সক্ষম হবে।
সূত্র: আমারদেশ নিউজ
