আঁধার ঘনিয়ে আসে

গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলার সময় আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম – গাছগুলো সব কোথায়! আঁধার ঘনিয়ে আসে

3
692

লেখকঃ অনিক আরণ্যক

গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলার সময় আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম – গাছগুলো সব কোথায়!

চারিদিকে ঝোপঝাড়, এলোমেলো গাছগাছালি, তার ঠিক মাঝখানটায় একেবারে ফাঁকা! এখানে যে সব বড়বড় অশুথ, হিজল আর শিল গাছ গুলো ছিল, সব শুদ্ধ হাওয়া।কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোও কেটে নেয়া হয়েছে।এত স্বর্গীয় রক্তিম গাছ কেউ কাটতে পারে আমার বিশ্বাস হয় না।সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের কি কোনো দায়ভার নেই? পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর সবকিছুই মানুষ নামক প্রাণীরা ধ্বংস করে দিচ্ছে একে একে।বিস্তীর্ন তৃণভূমিকে বানানো হয়েছে লোকালয়, কলকারখানা।খাল-নদী ভরাট করে চলছে দখলদারী।বিষাক্ত কার্বনে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে আবহাওয়া।বেহেশতের মত সুন্দর এই ধরনীকে নরকে করা হচ্ছে পরিণত।বিনিময়ে কী পাচ্ছি? কাড়ি  কাড়ি টাকা, আকাশচুম্বি দালানকোঠা,সভ্যতা? শিল্প-বিপ্লব আর পূঁজিবাদের আড়ালে আমরা কখন যে পৃথিবীকে ধ্বংস করে চলেছি নিজেরাও জানি না।আসলে জানি, কিন্তু ক্ষনিকের লাভের আশায় না জানার ভান করে থাকি।অথচ মাতৃতুল্য পৃথিবী নষ্ট হলে আমরাও যে বাচবোনা, আমাদের প্রজন্ম যে থাকবে না, এটা কেউ ভাবতে চাইছে না।

বিষন্ন মনে জঙ্গলের  গাছগাছালিহীন শুন্যতার দিকে তাকিয়ে আছি।এই শুন্যতা মানুষের অদূর ভবিষ্যতের শুন্যতার কথা ভাবায়।যেনো বলতে চাইছে- এখন না শুধরালে এক সময় আমার মতই মানুষের পরিণতি হবে।

জঙ্গলের এই ফাঁকা অংশে সবচেয়ে বেশি কাঠ দেয়া গাছগুলো ছিল।মেহগনি, শিল কড়ই, হিজল, অশুথ আরও নাম না জানা গাছ।তার মধ্যে কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো ছিল আমারই হাতে লাগানো।তখন আমার বয়স সাড়ে চার কী পাঁচ হবে।একদিন সকালে লোকজনের হৈ হল্লায় ঘুম থেকে উঠে গেলাম।বাবার হাত ধরে উঠোন পেরিয়ে খোলা রাস্তায় এসেই দেখি জঙ্গলের গভীর থেকে কালো ধোয়া কুন্ডলী পাকিয়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে! আমাদের গ্রামের উত্তর দিকে চাষাবাদের জমি আর দক্ষিণে এই ঘন জঙ্গল।যেটা আমাদের পাড়ার একদমে ঠিক পেছনেই।জঙ্গলের শেষমাথায় অর্থাৎ সর্ব দক্ষিণে রয়েছে নদী। যে নদীটা আরো পাঁচগ্রাম পেরিয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে।

গ্রামবাসীরা শুকনো পাতা আর মরা কাঠ সংগ্রহে যেত এই জঙ্গলে।তাদেরই কারো অসতর্কতায় হয়ত জঙ্গলে আগুন লেগে থাকবে।গ্রামবাসীর শত চেষ্টায়ও সে আগুন নেভানো সম্ভব হয় নি।হতাশ গ্রামবাসী দেখলো জঙ্গলের করুণ দশা।আমাদের প্রার্থনা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।পুরো একদিন অগ্নি তার তান্ডব লীলা চালালো।সকলে বলাবলি করছিল- “এভাবে চলতে থাকলে আমাদের রক্ষাকারী এ বন ধ্বংস হয়ে যাবে।“

ঐ সময় অবুঝ বাচ্চা হিসেবে আমি জানতাম না জঙ্গল আমাদের ঠিক কীভাবে রক্ষা করে! আমার ধারণা ছিল জঙ্গলে শুধু ভূত থাকে!

সেদিন রাতে এক অবাক করা ঘটনা ঘটল।হঠাৎ করেই মেঘের গর্জন দিয়ে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল।এত ভারি বর্ষন গ্রামবাসী বিগত বছরগুলোয় কখনো দেখেনি।যেন ঈশ্বর গ্রামবাসীর আর্তনাদ শুনেছেন। সেই বৃষ্টিতেই আগুন ধীরে ধীরে নিভে গেল।রক্ষা পেল বন।

সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এলে বাবার উদ্যোগে গ্রামবাসীরা মিলে জঙ্গলের সে পোড়া অংশ সাফ-সাফাই করলেন।মাটি পরিস্কার করলেন, তারপর সকলে মিলে শাল, কড়ই অশুথ, হিজল আরো নাম না জানা গাছের চারা লাগালেন।সেই সময়ই বাবা আমার হাতে তুলে দিলেন কিছু কৃষ্ণচূড়া গাছের চারা।আমি বাবার পাশে থেকে চারা গুলো লাগালাম।সেদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম-‘আচ্ছা বাব জঙ্গল আমাদের কিভাবে রক্ষা করে?‘

বাবা চারা গাছ লাগাতে লাগাতে আমাকে বোঝাতে লাগলেন।আমি সেদিন জানতে পারলাম আমাদের বেচে থাকার জন্য গাছ কতোটা জরুরি।জানতে পারলাম গাছ থেকে আমরা অক্সিজেন পাই, জ্বালানী কাঠ পাই, খাদ্য পাই।বুঝতে পারলাম এ জঙ্গল আমাদের জলোচ্ছাস আর নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে চলেছে যুগের পর যুগ! সবচেয়ে জরুরি কথা এ জঙ্গল আমাদের গ্রামকে বছরের পর বছর সমুদ্র থেকে ধেয়ে আসা ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা করে চলেছে!

জঙ্গল যে আমাদের ঝড়ের হাত থেকে বাঁচায় তা আমি প্রত্যক্ষ করলাম ২০০৭ সালে “সিডর“এর সময়।তখন আমার কৈশর বয়স।ঘূর্ণিঝড় সিডরে আমাদের পাশের গ্রামগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হলেও এই জঙ্গলের কারনে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি খুবই সামান্য হয়।তখন থেকেই এ জঙ্গলের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ভালোবাসা গভীর হল।আমি বুঝতে পারলাম আমাদের জীবনের একটা অংশ জুড়ে আছে এ জঙ্গল।

তার কিছু মাস পর আমাকে শিক্ষার জন্য শহরে পাড়ি জমাতে হয়।সবুজের সাথে শহরের কোনো লেনাদেনা নেই।হঠাৎ করেই যেনো স্বর্গ থেকে নরকে চলে এলাম।জীবণ সংগ্রামের জন্য মানুষকে কত কিছুই না করতে হয়! শিক্ষা শেষ করে একটা কোম্পানিতে চাকরী শুরু করি আর অর্থ জমাতে থাকি, আমার শৈশব-কৈশর কাটানো গ্রামের জন্য কিছু করার প্রয়াস থেকে।

দীর্ঘ তেরো বছর পর আজ আবার সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে গ্রামে ফিরে এলাম।

কিন্তু একি! গ্রাম কোথায়! এ যেনো ইট পাথররে স্তুপে চাপা পড়া গলিত লাশ! দোতলা, তিন তলা বাড়ি।পাকা রাস্তা-ঘাট।নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে একের পর এক ইটের ভাটা।আর জঙ্গলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স-মিল গুলো।সেখানে বড়বড় গাছের গুড়িগুলোকে নির্মমভাবে কেটে কেটে ফালি ফালি করা হচ্ছে।কোথায় আমার সবুজ গ্রাম? এ যেনো কাঠ আর ইটের পাতালপুরী।পুঁজিবাদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে আমার সবুজ গ্রামও রেহাই পায় নি।

গ্রামের এ বেহাল দশা আমি সইতে পারলাম না।আনমনেই জঙ্গলের দিকে ছুট লাগালাম।মনে হল একাকী জঙ্গলের সবুজে মিশে মৃতপ্রায় গ্রামের জন্য একটু আর্তনাদ করে উঠি, পুরোনো গ্রামের জন্য কাঁদি।ঝোপঝাড় আর বাঁশবন পেরিয়ে আসতেই আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম- গাছগুলো সব কোথায়?

আমার শৈশব কৈশরের মত চিরসবুজ গাছগুলোও আর নেই।শুধু পড়ে রয়েছে শূন্যতা! সেই শূন্যতার দিকে ছলছল চোখে দাড়িয়ে রইলাম।সূর্য ডুবি ডুবি করছে।

নীড়ে ফিরে যাওয়ার মত কোথাও কোনো পাখি নেই।দূরে কোথাও শেযালের কান্না শোনা যাচ্ছে।যেন অভিশাপ দিচ্ছে মানুষ নামক দানব গুলোকে।ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে চারিদিক।মানুষের ভবিষ্যতের মতেই অন্ধকার।

                                                   

Comments are closed.