শিক্ষা দুঃখ ও আশার মধ্যে সেতু বন্ধন স্বরূপ

শিক্ষা দুঃখ ও আশার মধ্যে সেতু বন্ধন স্বরূপ

0
10

শিক্ষার শুরু স্বাক্ষরতা দিয়ে অর্থাৎ সাক্ষরতা বলতে সাধারণত অক্ষর জ্ঞানসম্পন্নতাকেই বোঝায়।  সাক্ষরতা হচ্ছে পড়া, অনুধাবন করা, মৌখিকভাবে এবং লেখার বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করা, যোগাযোগ স্থাপন করা এবং গণনাকরার দক্ষতা। বর্তমানে এর সঙ্গে প্রযুক্তির দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষায় দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও সংযোজিত হয়েছে। ১৯৬৫ সালের ৮-১৯ সেপ্টেম্বর ইরানের তেহরানে বিশ্ব সাক্ষরতা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব দেয়া হয়। ১৯৬৫ সালের ১৭ই নভেম্বর প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালন করে ৮ সেপ্টেম্বর।

১৯৬৬ সালে ৮ সেপ্টেম্বর ইউনেস্কো প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালন করে।  প্রতিবছর একটি বিশেষ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সে বছর সাক্ষরতা দিবস পালন করা হয়। এবছরে ইউনেস্কো কর্তৃক নির্ধারিত প্রতিপাদ্য হলো: ‘কোভিড-১৯ সংকটঃ সাক্ষরতা শিক্ষায় পরিবর্তনশীল শিখন-শেখানো কৌশল এবং শিক্ষাবিদদের ভূমিকা’।

বর্তমানে এই সময়ের প্রেক্ষিতে, করোনাকালীন এই সংকটে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেমে না থেকে পরবর্তিত পরিস্থিতির সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এখন জুম অ্যাপ, গুগল মিট ইত্যাদি অ্যাপ দ্বারা ক্লাস পরিচালিত হচ্ছে যেখানে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে অনলাইনে ক্লাসে অংশগ্রহণ করছে। সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া শিক্ষাকার্যক্রম সমূহও প্রশংসনীয়। সংসদ টিভির মাধ্যমে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সকল শ্রেনির শিক্ষার্থীদের পড়ানো হচ্ছে। এছাড়া  বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে সঞ্চালন করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশে গঠনে এই নতুন সংযোজন হল সাক্ষরতার পরবর্ধিত রূপ।

বাংলাদেশের বর্তমান সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। বাংলাদেশের রয়েছে সাক্ষরতা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য। এ অঞ্চলে সাক্ষরতার জন্য সর্বপ্রথম উদ্যোগ গৃহীত হয় ১৯১৮ সালে নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ১৯৩৪ সালে খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ ও নবাব আবদুল লতিফ প্রমুখের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র। ১৯৬০ সালে ভি-এইড কার্যক্রমের আওতায় সফলতার সঙ্গে পরিচালিত বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয় শত শত দরিদ্র মানুষ।

 স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদযাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি সংবিধানের ১৫ নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করেন এবং ১৭ নং অনুচ্ছেদে ৬-১০ বছরের বালক বালিকাত জন্য বিনামূল্যে মৌলিক শিক্ষাপ্রদানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

“তুমি আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিবো।“ নেপোলিয়নের এই কথার সুর ধরেই আমাদের দেশের নারী জাতিকে অগ্রসর করতে বিভিন্ন উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে, কোটা প্রবর্তন করা হয়েছে এবং মেয়ে শিশুদের লেখাপড়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রমে নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

১৯৯০ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। ২০১০ সালে আধুনিক জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়। SDG-2030 এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করছে সরকারসহ বিভিন্ন NGO। বাংলাদেশে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো’র আওতায় বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ নিরক্ষরকে সাক্ষরতা জ্ঞান প্রদান করা হয়।  সাক্ষরতা বিস্তারে বিশাল অর্জনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতিস্বরূপ ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কার ১৯৯৮’ লাভ করে। ২০১৪ সালে সবার জন্য শিক্ষা এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাসমূহ সফলভাবে অর্জনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘শান্তিবৃক্ষ’ পদক পেয়েছেন, যা আমাদের জন্য গর্ব ও আনন্দের বিষয়।  

সাক্ষরতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তিই নয়; বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক মুক্তি প্রাপ্তি সম্ভব। একজন ব্যক্তি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেলে তা হবে কাগজে কলমে শিক্ষা। কিন্তু আমরা জানি,

গ্রন্থগত বিদ্যা পরহস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন হয়ে প্রয়োজন।

তাই শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয় বরং স্বশিক্ষিত হয়ে ভালো মানুষ তথা সুনাগরিক হওয়ার চেষ্টা করতে হবে প্রতিনিয়ত। সাক্ষরতা দিবসের এই দিনে আমরা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই এই বিষয়ে যে আমাদের যেমন সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি করতে হবে তেমনি নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে শিক্ষার অবিচ্ছিন্ন অংশরূপেও গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাই কমাতে পারে অপরাধ, গড়ে তুলতে পারে কর্মঠ জাতি, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং উন্নত রাষ্ট্র। নেলসন ম্যান্ডেলার উক্তি,

Education is the most powerful weapon which you can use to change the world.

বঙ্গবন্ধুর প্রথম উদযাপন করা সাক্ষরতা দিবসেরই ধারাবাহিকতায় সরকার প্রতিবছর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালন করে আসছে। এ বছরও কোভিড-১৯ মহামারির কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা ( এসডিজি ২০৩০) এর ৪র্থ লক্ষমাত্রা হল শিক্ষা ও সাক্ষরতা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রতিটি ছেলে ও মেয়ে বিনাবেতনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা পেয়ে থাকে। এই লক্ষেই এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ, এগিয়ে চলেছে পুরো বিশ্ব।

নামঃ আফরা মেহজাবীন শীন

শ্রেণিঃ ৯ম

সরকারি পিএন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, রাজশাহী