More
    Homeফিচারএকজন ম্যাজিশিয়ান হয়ে ওঠার গল্প ম্যাজিশিয়ান কি সত্যিই ম্যাজিক জানে

    একজন ম্যাজিশিয়ান হয়ে ওঠার গল্প ম্যাজিশিয়ান কি সত্যিই ম্যাজিক জানে

    লেখকঃ তপু মনোয়ার

    আজ শোনাবো একজন ম্যাজিশিয়ানের গল্প যার নাম তপু মনোয়ার।কেন ম্যাজিশিয়ান হলেন,কি করে এটির প্রতি ভালোবাসা জন্মালো এমন প্রশ্ন করতেই কিছুটা সময় নিয়ে গল্পের ঝাপি খুলে বসলেন।ছোটদেরবন্ধুতে আজ আমরা সেই সব কথাই ম্যাজিশিয়ানের কলমের ভাষায় তুলে ধরছি।

    ম্যাজিক আমার একমাত্র ভালোবাসা। কথায় বলে, আত্মার ছেঁড়াসূতো যদি এর যোগ্য প্রান্তকে খুঁজে পায় সে এমন গিট্টু বাঁধে তা কখনই তা খোলা সম্ভব না। আমার সাথে ম্যাজিকের সম্পর্ক ঠিক তেমনই। সেই গিট্টু কবে বাঁধা হলো চলুন এবার সেই গল্পে চলে যাই। লেখাটা যদি বড় হয় তবে ক্ষমাপ্রার্থী। কারণ ভালোবাসার গল্প কখনও সংক্ষিপ্ত করা যায় না।

    সেই ২০০৪ এর দিকের কথা। স্কুলে খুব ফেল্টুস প্রকৃতির ছাত্র ছিলাম বিধায় বন্ধুমহল তেমন ছিল না। তাই তারে জামিন পার সিনেমার সেই দারসিলের মতই অনেকটা একাকী জীবন ছিল। একদিন স্কুল থেকে ফিরে যখন টিভি নামক বোকাবাক্সটির রিমোটের বোতাম চাপছিলাম একটি বিদেশী চ্যানেলে চোখজোড়া হার্ডব্রেক করলো। ডেভিড ব্লেইন স্ট্রীট ম্যাজিক নাম একটি প্রোগ্রাম হচ্ছিল। এতো কাছের থেকে মানুষের চোখের সামনে কি অদ্ভূত কান্ড ঘটাচ্ছেন ডেভিড।

    এতোদিন কিন্তু ম্যাজিক দেখতে ভালো লাগতো তবে এখন কেন জানি শিখতে ইচ্ছে করছে। বলতে না বলতেই সেই প্রোগ্রামেই ডেভিড ব্লেইনের একটি ম্যাজিক নিয়ে রিসার্চ শুরু। ম্যাজিকটা আবার দেখাবে কখনও অপেক্ষার প্রহর গুনছি। কারণ বুঝতে পারলাম আরেকটু দেখলে বোধ হয় ম্যাজিকটা ধরতে পারবো। তিন দিন পর অনুষ্ঠানসূচীতে দেখতে পেলাম প্রোগ্রামটির অনুষ্ঠানটি রিপিট ট্যালিকাস্ট হবে। তখন ইউটিউব নামক বন্ধুটির কথা জানতাম না। আর বাসায় ইন্টারনেটও ছিল না।

    তার মানে বুঝতেই পারছেন আমি প্রযুক্তির তিন পর্দা বদল হতে দেখা মানুষদের মধ্যে একজন। এবার কিন্তু ধরে ফেলেছি চালাকি। ম্যাজিকটি দেখাতে লাগলাম আসের পাশের সবাইকে। ধীরে ধীরে একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম এখন নতুন নতুন পরিচিত মুখ জীবনবাক্সে নাম লিখাতে শুরু করেছে। সবাই যখন অবাচ হয় খুব সহজ হয়ে যাচ্ছে বন্ধুমহল তৈরীর বিষয়টা। কিন্তু আরেকটা ম্যাজিক দেখতে চাইলে তপু মনোয়ার সাহেব মানে আমার সংগ্রহে কোন ম্যাজিক জানা নেই। তখন হাত খরচার জন্য টাকাও তেমন পেতাম না। এভাবে দিন গড়াতে গড়াতে অনেকটা সময় চলে গেল।

    তবে নতুন ম্যাজিক শেখার সূত্র খোজার কাজও চলছিল । ঢাকায় আসলাম কলেজে ভর্তি হবো। বিভিন্ন কলেজে ফর্ম কেনার জন্য যে টাকা বাসা থেকে দিত আমি তার মাঝ থেকে কিছু টাকা খরচ করে ম্যাজিকের দোকান খোজ করতাম। ম্যাজিক শেখানোর কোন প্রতিষ্ঠান খুজে পাইনি কোথাও তবে যাদু শিখুন লেখা অনেক দেখেছি ফোন নাম্বার শুধু দেয়া থাকতো। একটা দোকান খুজে পেলাম তবে কোন ম্যাজিকই সিকরেট জানার পর ভালো লাগতো না। বেশ কয়েকদিন গিয়েছি সেই দোকানে। কিছু সরন্জামও কিনেছি ছোট ছোট।

    একদিন ঐ দোকানে এক লোককে দেখলাম ম্যাজিক দেখাতে। পরনে ছিল সাধারণ লুঙ্গি আর শার্ট। প্রথমে পাত্তা দিচ্ছিলাম না তবে লোকটা যা করে দেখালো মনটা জিতে নিল। একটা পয়সাকে ভ্যানিশ করে আবার দু হাত খালি দেখিয়ে আবার নিয়ে আসল আবার একটা থেকে দুটো পয়সা বানালো।দুটো পয়সা আবার একটা করে পরীক্ষা করতে দিল। মনে হচ্ছিল আসলেই মন্ত্রের মত কিছু ঘটছে। লোকটার বাসা পর্যন্ত গিয়েছিলাম।কিন্তু শিখতে চাইলে তিনি বলতে লাগলেন একটি লম্বা কবিতার মত মন্ত্র। সেটা নাকি লিখে বা রেকর্ড করে নিয়ে মুখস্থ করলে হবে না। তার কাছে এসে এসে এক লাইন করতে বুলি বিবরাতে শিখতে হবে।

    ম্যাজিশিয়ান তপু মনোয়ার

    ও বলা হয়নি আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। এদিকে কোন কলেজে ঠাই মেলেনি বলে ফেরত যাওয়ার সময় চলে এসেছে। তবে সেই যে দোকানের কথা বলছিলাম সেখানে একটি ম্যাজিকের বই পেয়েছিলাম। “ক্লোজআপ ম্যাজিক“। বইটি লিখেছেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় ” প্রফেসর মাইনুল খান”। সেই বইটিতে বিভিন্ন ধরনের ম্যাজিক এবং হাত সাফাইয়ের ব্যাপার সুন্দর করে বলা আছে। এমনকি ঐ লুঙ্গি পড়া লোকটা কিভাবে পয়সা ভ্যানিশ করেছিল তাও বলা আছে। তখন বুঝতে পারলাম আসলে উনি শিখাতে চাচ্ছিলেন না।

    এখন কিন্তু ম্যাজিকটা আমি অনেক ভালো দেখাতে পারি। এখন যদি দেখা হয় লোকটিকে অবশ্যই দেখাবো ম্যাজিকটা। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম যে সব সরন্জাম আমি কিনেছি প্রচুর দাম নিয়েছে। ছোট মানুষ যেহেতু এতো সাধ্যে কুলাচ্ছিল না। তখন আরেকটা শিক্ষা পেলাম। একটা না দুইটা শিক্ষা পেলাম। এক, ম্যাজিকের দোকানদাররা ম্যাজিক বিক্রি করলেই তাদের দায়িত্ব শেষ আর আরেকটা হলো, ঐ ম্যাজিকগুলো মেলাতেও বিক্রি হচ্ছে। তার মানে ৭০% মানুষের ঘরে ম্যাজিকগুলো আছে। তবে আমি ঐ বই যেটা পেয়েছি ওটা থেকেই ম্যাজিকগুলো করার চেষ্টা করতাম।

    ম্যাজিক কিনে আর লস করতে চাই না। কম দামের ম্যাজিক বেশী দামে বিক্রি করলে দোকানদাররা বলতো “মুরগী জবাই হয়েছে”। আগে না বুঝলেও পরে বুঝেছি আমিও মুরগী হয়েছি হাজারবার । ২০০৯ সালে একটি প্রতিযোগীতাতে অংশ নিয়ে সাফল্যের সাথে হেরেছিলাম। কোন গুরু ছিল না তো তাই। তবে ওটা আমার ম্যাজিকের ভালোবাসায় কোন সাইড ইফেক্ট আনেনি। ২০১১ তে ফিরে যাই এবার। ঢাকায় আসলাম। ভার্সিটি ভর্তি হলাম। এখন আমি ভার্সিটিতে হিরো কারণ ম্যাজিক দেখিয়ে সবাইকে অবাক করি প্রতিদিন। শো পেতে শুরু করলাম। পেইড শো। যা দেখাচ্ছি ভালোই হচ্ছে। সবাই ভালো প্রশংসা করছে।

    নিজে নিজে গত দুটো বছর নেট ঘেটে আর অভিজ্ঞতা থেকে নিজে নিজে যা পেরেছি করতে থাকলাম। শো এর টাকা দিয়ে এখন বিদেশী বই,ডিভিডি কিনতে শুরু করলাম। আর ম্যাজিক শো তো চলছেই। এক সময় সেই মানুষটার দেখা পেলাম যার বই পড়ে ম্যাজিক শিখেছি। প্রফেসর মাইনুল খান স্যার। তার কাছেই পরে তালিম নিতে শুরু করলাম হাতে কলমে।তিনিই মূলত আমাকে নতুন করে ম্যাজিশিয়ান গড়ে তুললেন। ম্যাজিক শুধু ট্রিকস নয় এর সাথে কাজ করে শোমেনশীপ,উপস্থাপনা এবং ব্যক্তিত্ব এবং এর ইতিহাস সম্পর্কে পড়াশোনা। মানুষকে আনন্দ দেয়ার যে দায়িত্ব সেটা এতো সোজা না।

    ম্যাজিশিয়ান তপু মনোয়ার

    ম্যাজিশিয়ানের সাথে সাথে আর্ট বা শিল্পচর্চাও জরুরী কারণ ম্যাজিক শিল্পের বাইরে কিছুই না। আবারও বলি,ম্যাজিক একটি শিল্প কোন মন্ত্রবুলির ফলাফল নয়। তবে যখন মানুষকে আনন্দ দেয়ার এই দায়িত্ব নেবার পর খেয়াল করলাম আমাদের দেশেই এই শিল্প নিয়ে এগিয়ে যাওয়াটা খুব কষ্টের। কারণ অন্যান্য শিল্পের মতো ম্যাজিকটা খুব একটা সমান তালে বেগবান হচ্ছে না। খুব কম ম্যাজিশিয়ানই আছেন যারা এই ম্যাজিক করেই জীবন চালাচ্ছেন। কারণটা কি? আমি নিজের অভিমত প্রকাশ করছি এখন এক এক করে।

    ১। গান,অভিনয় নিয়ে ভাবলেও আমাদের মিডিয়াগুলো ম্যাজিক নিয়ে প্রচারের ব্যাপারটা খুব কম ভাবেন। এই জন্য প্রতিভাবান ম্যাজিশিয়ানরা প্রকাশিত হতে পারছে না।

    ২। সরকারী বা বেসরকারী মহল গুলো ম্যাজিক এর উন্নয়ন এর জন্য চিন্তা করছেন না।

    ৩। মেলায় বা দোকানে টাকা দিলেই ম্যাজিক কিনে সহজেই ম্যাজিশিয়ান হবার প্রবণতা বেশী। সেই বিক্রেতারা হয়তো ঠিক ভাবে ম্যাজিকটা দেখাতেও জানেনা সেটা বিবেচনা করে হয়তো অনেকেই ভেবে নিচ্ছে ম্যাজিকটা হয়তো শিল্প না।

    ৪। শিক্ষিত ম্যাজিশিয়ানদের সংখ্যা কম তাই অনেকেই হয়তো মনে করেন ম্যাজিশিয়ানরা অশিক্ষিত। কোন কাজ নেই তাই ম্যাজিক শো করে উপার্জন করছে।

    ৫। ফোক ফ্যাস্টিভ্যাল এর মত আন্তর্জাতিক মানের এ দেশে ম্যাজিক ফ্যাস্টিভ্যাল বা কনভেনশন করার জন্য সরকারী বেসরকারী দুই মহল থেকেই সার্বিক সহযোগীতার প্রয়োজন। ভারত কিন্তু এ ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে। তাহলে বাংলাদেশের সাথে অন্যান্য দেশের ম্যাজিশিয়ানদের ঐক্যবন্ধন আরও শক্ত হতো।

    ৬। একটা ভালো ম্যাজিক শেখার প্রতিষ্ঠান থাকাটা খুব জরুরী। এতে কুসংস্কার দূর হবার সাথে সাথে সবার আগ্রহ আরও বাড়বে।

    ৭। ম্যাজিক সরন্জাম বাইরের থেকে আনার সহজ মাধ্যম এবং ছাড়ানোর জন্য কোন HS Code নেই আমদানী শুল্ক সংক্রান্ত বইগুলোতে। তাই ভালো ম্যাজিকের সরন্জাম আনায়নে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা আবশ্যক।

    ৮। গান বাজনার জন্য অনেক টাকা দিলেও ম্যাজিক শো এর জন্য খুব একটা কেউ চিন্তাও করেন না আর কেউ করলেও খুব একটা সম্মানী দিতে চান না। ম্যাজিক যে শুধু মাত্র শিশু নয় সার্বজনীন ব্যাপারটা অনেকেই মানতে চান না। মানুষকের আনন্দ দেয়ার এই দায়িত্ব আজীবন চালিয়ে যাবো। আমি মনে করি ম্যাজিশিয়ানরা মনের চিকিৎসক যা মন ভালো করার চিকিৎসা দেন যাতে কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। আশা করছি এই মন ভালো করার কাজ আমার সারাজীবন চলতে থাকবে।

    একজন ম্যাজিশিয়ান খুব সহজেই শিশু কিশোরদের মন জয় করে নিতে পারে।ম্যাজিশিয়ান যেন হ্যামিলনের বাশিওয়ালা যে তার বাশিতে ফু দিলেই শিশু কিশোর কিশোরীরা মন্ত্রমুগ্ধের মত ছুটে আসে।


    ছোটদেরবন্ধু
    ছোটদেরবন্ধুhttps://www.chotoderbondhu.com
    সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখতে দেখতে জীবনের এক একটি দিন পার করা।সেই ধারাবাহিকতায় ছোটদেরবন্ধু গড়ে উঠছে তিল তিল করে।
    RELATED ARTICLES

    Most Popular