ফিচার সম্পাদকীয় 

হতাশ হওয়ার আগে এই গল্পটি পড়ুন

Related image

দিনটা ছিল ২০১১ সালের ১২ই এপ্রিল।

বাইশ বছরের একটা মেয়ে লক্ষনৌ থেকে পদ্মাবতী এক্সপ্রেসে উঠেছিল দিল্লী যাবে বলে। রাতের ট্রেন, তাড়াহুড়োয় সে একাই চলেছে।

মনে তার চাপা আনন্দ। CISF এ চাকরিটা এবার বোধ হয় হয়েই যাবে। আর হবে নাই বা কেন? জাতীয়স্তরের ভলিবল খেলোয়াড় সে, সঙ্গে ফুটবলও খেলে মাঝেমাঝেই। স্পোর্টস কোটায় অনেকদিন আগেই তার চাকরিটা হয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল, এখনো যে হয়নি এটাই আশ্চর্যের।

মেয়েটা যখন লক্ষনৌ থেকে ট্রেনে উঠল তখন রাত প্রায় বারোটা। হঠাৎ ইন্টারভিউয়ের চিঠি আসায় তাড়াহুড়োয় রিজার্ভেশন কিছুতেই পাওয়া যায়নি, মেয়েটা কোনোরকমে জেনারেল কামরায় একটু জায়গা পেয়ে চুপ করে বসেছিল। ঘুমোলে চলবে না, সঙ্গের ব্যাগে টাকাপয়সা, রেজাল্ট, খেলার সার্টিফিকেট সবই আছে।

Image result for অরুণিমা সিনহা

তবু একনাগাড়ে বসে থাকলে সবারই ঝিমুনি আসে। তার ওপর রাতের ট্রেন এমনিতেই জোরে চলে। ফলে পদ্মাবতী এক্সপ্রেস যখন চেনাতি ষ্টেশন থেকে জোরে হুইসল বাজিয়ে রওনা দিল, মেয়েটা ঘুমে প্রায় ঢুলে পড়েছে পাশের দেহাতী মহিলাটির কাঁধে। সারাদিন মাঠে প্র্যাকটিস করে এমনিতে ক্লান্ত ছিল, তার ওপর জানলা দিয়ে আসা ঠাণ্ডা হাওয়া, ঘুম তো আসতে বাধ্য।

কামরার অন্য লোকেরাও ঝিমোচ্ছে। কেউ বা তখনো জেগে আছে, হাই তুলছে ঘনঘন।

মেয়েটা একটা ব্যাপার বুঝতে পারেনি, ও যেখানে বসেছিল, তার চেয়ে কয়েকহাত দূরে তিনজোড়া চোখ ওর ওপর সমানে নজর রাখছিল। একা সোমত্ত মেয়ে রাতের সাধারণ কামরায় বিরল তো বটেই, তবে তার চেয়েও বেশি যেটা ওই চোখগুলোকে আকর্ষণ করছিল, সেটা হল মেয়েটার গলায় ট্রেনের দুলুনিতে মৃদুমন্দ দুলতে থাকা খাঁটি সোনার হারটা। টি-শার্টের ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। লোকতিনটে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। যখন বুঝল মেয়েটা অকাতরে ঘুমোচ্ছে, ক্লান্ত চোখদুটো একদম বোজা, নিঃশ্বাস পড়ছে একলয়ে, তখন একজন আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল।

Image result for অরুণিমা সিনহা

মেয়েটা বসেছিল লোয়ার বার্থের একদম কোণায়। লোকটা কিছুই হয়নি এমন ভাব করে বাথরুম যেতে যেতে একটুও না ঝুঁকে অভিজ্ঞ হাতটা রাখল মেয়েটার গলায়।

কয়েক মাইক্রোসেকেন্ড। তারপরেই টান মেরে ছিঁড়ে নিল হারটা।

পরিকল্পনাটা ছিল, লোকটা হারটা ছিনিয়ে নিয়েই বাথরুমের দিকে চলে যাবে, আর সেটা মেয়েটা বা অন্য কেউ দেখে ফেলার আগেই বাকি দুজন গিয়ে পরিস্থিতি বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে।

কিন্তু প্ল্যানমাফিক ব্যাপারটা এগোল না। মেয়েটার গলা থেকে হারটা ছিনিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার ঘুম ভেঙে গেল, মুহূর্তে কি হচ্ছে বুঝতে পেরে হাত দিয়ে লোকোটার কাছ থেকে হারটা টানতে শুরু করল মেয়েটা।

মুশকো লোকটা পরিস্তিহিত বেগতিক দেখে সেই অবস্থাতেই টানতে টানতে বাথরুমের দিকে চলল। বাকি দুজন লোকও এগিয়ে আসতে লাগল। মেয়েটাও ছাড়ার বান্দা নয়, এই হারটা তার সর্বস্ব, সে হ্যাচড়াতে হ্যাচড়ড়াতে লোকটার সঙ্গে যেতে লাগল, সঙ্গে মুখে চিৎকার করতে লাগল, “চোর! চোর! বচাইয়ে মুঝে!”

অদ্ভুত ব্যাপার! মেয়েটার তারস্বরে চিৎকারে যারা জেগেছিল তারা তো সচকিত হয়ে উঠলই, কামরায় যারা ঘুমোচ্ছিল, তারাও ধড়মড়িয়ে উঠল। কিন্তু তিনটে লোকের সঙ্গে একটা মেয়ে একা লড়ে যাচ্ছে দেখেও তাদের মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। তারা শুধু নিজেদের চোখগুল দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে দৃশ্যটা গিলতে লাগল।

একজনও এগিয়ে এল না।

ওদিকে মেয়েটা লোকতিনটের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে করতে বাথরুমের আগের ফাঁকা জায়গাটায় এসে পড়েছে। ট্রেন ততক্ষণে বেরিলির কাছাকাছি এসে গেছে, হু হু করে হাওয়া ঢুকছে খোলা দরজা দিয়ে। #

মেয়েটার হাতদুটো মুচড়ে ধরেছিল একটা লোক, সেই অবস্থাতেই একটা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সে প্রাণপণে ঘুষি চালাল লোকটার মুখে। সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় লোকটা ওর পেটে প্রচণ্ড জোরে হাত দিয়ে আঘাত করল। আঘাতের তীব্রতায় মেয়েটার নাকমুখ কুঁচকে গেলেও সে ততক্ষণে দাঁত বসিয়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছে তৃতীয় লোকটার হাত, চামড়া ছিঁড়ে মাংস দেখা যাচ্ছে সেখানে।

মিনিটতিনেকের মধ্যেই লোকগুলো প্রমাদ গুণল। বেরিলি ষ্টেশন আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢুকবে ট্রেন, এই মেয়ে তো সহজে ছাড়ার বান্দা নয়! এত কিল-চড়-ঘুসিতেও ঠাণ্ডা হচ্ছে না!

লোকতিনটে একঝলক নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করল, তারপর চোখ বুলিয়ে কামরার ভেতরের দিকে। সেখানে তখনো অন্তত তিরিশজোড়া চোখ এদিকে উৎসুক নয়নে চেয়ে আছে, কিন্তু কারুর কোন বক্তব্য নেই। নাহ, এদের নিয়ে চাপ নেই।

যে লোকটা হারটা প্রথম ছিঁড়তে গিয়েছিল, সে নিজের ঠোঁটটা চেটে নিল একবার, মেয়েটার দুটো হাতই পেছন দিকে চেপে ধরা আছে, তবু সে পা দিয়ে লাথি কষিয়ে যাচ্ছে।

প্রথম লোকটা ইশারা করতেই প্রায় আলোর গতিতে লোক তিনটে গিয়ে গেল দরজার দিকে, তারপর হু হু গতিতে ছুটতে থাকা ট্রেন থেকে পোড়া সিগারেটের টুকরো ফেলার মত ছুঁড়ে ফেলে দিল বাইশ বছরের জাতীয় স্তরে ভলিবল খেলা মেয়েটাকে।

Related image

মুহূর্তে একরাশ কালো শূন্যতা। অন্ধকার হয়ে গেল একটা সোনালী ভবিষ্যৎ। গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল অনেক স্বপ্ন।

মেয়েটা ছিটকে পড়ল পাশের রেললাইনের ট্র্যাকে। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিয়তির টানে সেই লাইনে ছুটে এল আরেকটা ট্রেন। ওর বাঁ পা’টা ট্রেন থেকে পড়ে আগেই ভেঙে গিয়েছিল, এবার তার ওপর ট্রেন ছুটে গিয়ে বড় থেকে ছোট, সবরকম হাড়গুলোকে ধুলোর মত গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিল। তলপেটে আগে থেকেই রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছিল, এখন প্রচণ্ড আঘাতে চিড় ধরল তলপেটের নীচের হাড়গুলোতেও। কোমরের প্রধান হাড়টাও মড়মড়িয়ে ভেঙে গেল।

অমানুষিক কষ্ট সহ্য করতে করতে মেয়েটা জ্ঞান হারাল।

কি ভাবছেন? কষ্টে মুচড়ে উঠছে মন? রাগ হচ্ছে কামরার নীরব দর্শকগুলোর প্রতি?

দাঁড়ান। গল্প এখনো শেষ হয়নি।

কাট-টু।

২০১১ থেকে এবার সোজা চলে আসুন ২০১৯ সালের ৪ঠা জানুয়ারি। এইতো কয়েকদিন আগে সেই মেয়েটা অ্যান্টার্কটিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট ভিনসন জয় করেছে। বিশ্বের প্রথম মহিলা অ্যাম্পিউইটি হিসেবে।

হ্যাঁ, এই ভারতকন্যার নাম অরুনিমা সিনহা।

অরুণিমা ২০১৩ সালেই মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে ফেলেছে, তার একটা পা প্রোস্থেটিক, অর্থাৎ অ্যাম্পিউট করা। আর বাকি শরীরটা অজস্র জায়গায় ভাঙা।

একটা রাতের মধ্যে সে যখন জাতীয় স্তরের খেলোয়াড় থেকে প্রতিবন্ধীতে পরিণত হয়েছিল, আশপাশের মানুষগুলর চোখে ফুটে উঠেছিল বেদনা, হতাশা।

আহা! এমন মেয়েটা শেষ হয়ে গেল!

Related image

সেই করুণা অরুণিমা নিতে পারেনি। সে কারুর করুণার পাত্রী নয়। সেই ভয়াবহ ঘটনার পর মাসকয়েক হাসপাতালে থেকে সে যখন ছাড়া পেয়েছিল, তারপর থেকেই শুরু করে দিয়েছিল বিরামহীন ট্রেনিং। মাত্র দুইবছরের মধ্যে প্রথম মহিলা অ্যাম্পিউটি হিসেবে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে সে চমকে দিয়েছিল সবাইকে।

সঙ্গে সে এই ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যেই শুরু করে দিয়েছে নিজের সংস্থা অরুণিমা ফাউন্ডেশন যারা দুঃস্থ ও প্রতিবন্ধী শিশুদের খেলায় প্রেরণা জোগায়, সাহায্য করে। ২০১৫ সালে সে পেয়েছে পদ্মশ্রী, সংবর্ধিত হয়েছে দেশেবিদেশে।

গতকাল অ্যান্টার্কটিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট ভিনসন জয় করার পর সে জানিয়েছে পৃথিবীর সব উঁচু শৃঙ্গগুলো সে জয় করতে চায়। চূড়ায় উঠে সে বলতে চায়, “দ্যাখো আই এম অন দ্য টপ!”

সে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চায় হতাশা, অসম্ভব, শেষের মত শব্দগুলোকে। পাল্টে দিতে চায় সেই মানুষগুলোর ধারণাকে যারা ভেবেছিলেন ও চিরকালের মত শেষ হয়ে গেছে।

আসুন মন থেকে শুভেচ্ছা জানাই

অরুণিমা-র মত হিরো আরো উঠে আসুক, সমস্ত নেগেটিভিটিকে হেলায় ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে জয় করুক তারা স্বপ্ন, এমনই আশা রইল।

যারা প্রতিনিয়ত জীবনসংগ্রামে, পরীক্ষায়, বা সামাজিক সমস্যায় হতাশ হয়ে পড়েন, তাঁদের মনেও কিন্তু কোন এককোণে অরুণিমা সিনহা লুকিয়ে রয়েছে।

দরকার শুধু তাকে মন থেকে বের করে আনার!

জাজাফী

2,532 total views, 1 views today

Facebook Comments

আরও অন্যান্য লেখা