কিশোর কিশোরী সংবাদ শিশু কিশোর নির্যাতন 

আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে ধ্বংস করছি

“আজকের শিশু, আগামী দিনের ভবিষ্যৎ”, এই ভবিষ্যৎ কে আমরা সচেতন, অবচেতন ভাবে দুঃখ, কষ্ট দিয়ে তাদের স্বাভাবিক বেড়ে উঠাকে ব্যাহাত করছি। এর ফলে আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে ধ্বংস করছি। শিশু বলতে বুঝায় (০-১৮) বছর পযর্ন্ত । আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটা প্রচার বুঝিয়ে দেয়, আমাদের দেশের আইন কতটা দুর্বল । সরকার একদিকে প্রচার করে শিশু শ্রম অবৈধ বা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। অন্যদিকে প্রচার করে কারিগরি শিক্ষার । ১৪-১৫ বছরের ছেলেমেয়েদের জন্য কারিগরি শিক্ষার এই প্রচার অবচেতন ভাবে হলেও একটা নির্যাতন। ইতালিয়ানদের মতো আমাদেরও উচিত শিশুদের মানবিক, মূল্যবোধ, তত্ত্বভিত্তিক শিক্ষা শেষ করে, কারিগরি শিক্ষা দেওয়া। যেন তারা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর অপরাধ করার পূর্বে তাদের বিবেকবোধ কাজ করে। মূল কথায় আসি,

শিশু নির্যাতন কি ?

শিশু নির্যাতনের প্রতি শব্দ শিশুর প্রতি নির্দয় আচরন। শিশু নির্যাতন হল বিশেষত বাবা-মা বা অন্য কোন অভিবাবক দ্বারা কোন শিশুর প্রতি শারীরিক, মানসিক দুর্ব্যবহার করা বা শিশুকে অবহেলা করা। বাবা-মা বা অভিবাবক পর্যায়ের কারো কোন কার্য বা অসম্পুর্ণ কোন কার্য দ্বারা কোন শিশু সত্যিকারভাবে বা ধীরে ধীরে ক্ষতির সম্মুখীন হলে তা শিশু নির্যাতনের মধ্যে অর্ন্তভূক্ত হবে। সেটা হতে পারে বাড়িতে, কোন প্রতিষ্ঠানে, স্কুলে, কোন সম্প্রদায়ে, এককথায় শিশুটি যেখানে অবস্থান করে।

বিশেষজ্ঞদের মধ্যে শিশু নির্যাতনের সংজ্ঞায় কোন কোন বিষয়কে শিশু নির্যাতন বলা হবে তা নিয়ে ভিন্নতা দেখা যায়। আইন, শিক্ষক এবং চিকিৎসকরা একেক জন একেক ভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। সাহিত্যে শিশু নির্যাতন এবং শিশুর প্রতি নির্দয় আচরণকে পারস্পরিকভাবে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। শিশুর প্রতি নির্দয় আচরণ একটি সামগ্রিক সংজ্ঞা যা দিয়ে শিশুর প্রতি সকল ধরনের নির্যাতন এবং অবহেলাকে বুঝানো হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) শিশু নির্যাতন এবং শিশুর প্রতি নির্দয় আচরণকে সংজ্ঞায়িত করেছে “সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, অবহেলা বা ঐ ধরনের কোন কাজ অথবা বানিজ্যিক বা অন্য কোনভাবে শোষন করা ইত্যাদি যার ফলে কোন শিশুর বাস্তবিক শারীরিক ক্ষতি, জীবনের হুমকি, বেড়ে উঠা, মর্যাদা, দায়িত্ববোধ, বিশ্বাস বা ক্ষমতা ইত্যাদির ক্ষতি হয় বা ক্ষতির কোন আশংকা থাকে তাকে শিশু নির্যাতন এবং শিশুর প্রতি নির্দয় আচরণ হিসেবে গন্য করা হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চার ধরনের শিশুর প্রতি নির্দয় আচরণকে ভাগ করেন: শারীরিক নির্যাতন; যৌন নির্যাতন; মানসিক নির্যাতন; এবং অবহেলা নির্যাতন।

শারীরিক নির্যাতন :-

বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোন বিষয়গুলোকে শারীরিক নির্যাতন বলা হবে তা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। শারীরিক নির্যাতন এককভাবে সংগঠিত হয় না বরং অন্য আচরণের সাথে যুক্ত হয়ে সংগঠিত হয়ে থাকে যেমন কতৃত্বমূলক নিয়ন্ত্রন করতে গিয়ে, চিন্তিত করে এমন কোন আচরণের ফলে এবং বাবা-মায়ের তরফ থেকে উষ্ণ সম্পর্কের অভাবে।

শিশুর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার উপর ইচ্ছাকৃত শারীরিক জোর খাটানো হলে তার ফলে কোন শারীরিক ক্ষতি, বেচে থাকার প্রতি হুমকি দেখা দিলে, বেড়ে ওঠার বা মর্যাদা হানি হলে বা হবার সম্ভাবনা থাকলে এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে শিশুকে আঘাত করা, পিটানো, লাথি মারা, ঝাকানো, কামড়ানো, গলা টিপে ধরা, দগ্ধ করা, পোড়ানো, বিষ প্রয়োগ করা এবং শ্বাসরোধ করা। শিশুর বিরুদ্ধে কৃত অত্যাধিক শারীরিক নির্যাতনগুলোকে যে বস্তু দিয়ে শাস্তি দেয়া হয়েছে তা দ্বারা পরিমাপ করা হয়।

জোয়ান ডুরান্ট এবং রন এনসম লিখেছেন যে বেশির ভাগ শারীরিক নির্যাতন হল শারীরিক শাস্তি সেটা হতে পারে উদ্দেশ্যপূর্ণ, আচরণগত রীতি নীতি এবং তার প্রভাবে প্রভাবিত। শারীরিক নির্যাতন এবং শারীরিক শাস্তির সংজ্ঞা অংশত একই হওয়ায় দুটোর মধ্যে সুক্ষ্ম বা একেবারেই কোন পাথর্ক্য করা যায় না। উদাহরণসরূপ, জাতিসংঘের সাধারণ স্টাডিতে শিশুর প্রতি নির্যাতন সম্পর্কে লিখেছেন:

শারীরিক শাস্তির মধ্যে অর্ন্তভুক্ত আছে শিশুকে হাত বা চাবুক, লাঠি, বেল্ট, জুতা, কাঠের চামচ ইত্যাদি দ্বারা আঘাত করা (‘করাঘাত’, ‘থাপ্পড়’, ‘পাছায় চড় মারা’)। কিন্তু এর মধ্যে আরো থাকতে পারে শিশুকে লাথি মারা, ঝাকানো, ছুড়ে মারা, ঘষানো, চিমটি কাটা, কামড়ানো, চুল টানা বা কানে চাপড় মারা, শিশুকে অস্বস্তিকর অবস্থানে থাকতে বাধ্য করা, পোড়ানো, ছ্যাকা দেয়া অথবা জোর পূর্বক কোন কিছু খেতে বাধ্য করা (উদাহরণসরূপ, সাবান দিয়ে শিশুর মুখ ধুতে বাধ্য করা বা ঝাল মশলা খেতে বাধ্য করা)।

বেশিরভাগ দেশেই যেখানে শিশু নির্যাতন আইন চালু আছে সেখানে ইচ্ছাকৃত মারাত্মক আঘাত প্রদান করা বা কোন কার্য যা শিশুকে অবশ্যই মারাত্মক আঘাত বা মৃত্যু ডেকে আনতে পারে এরূপ কার্যকে অবৈধ গন্য করা হয় এবং কালশিরে পড়া, গায়ে আচড় কাটা, পোড়া, ভাঙ্গা হাড়, ক্ষত ছাড়াও পুন পুন বিপত্তি ঘটানো এবং দুর্ব্যবহার করার ফলে কোন শারীরিক আঘাত পেলে তা নির্যাতন হিসেবে গন্য করা হবে। একাধিক আঘাত বা ভাঙ্গা যা সারছে বা সারার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে এমন হলে তা নির্যাতনের প্রতি নির্দেশ করে এবং সন্দেহের উদ্রেক করে।

যৌন নির্যাতন

আমাদের দেশে বর্তমান এই সমস্যা মারাত্বক আকার ধারণা করেছে। শিশু যৌন নির্যাতন হল এক প্রকারে শিশু নির্যাতন যেখানে কোন প্রাপ্তবয়স্ক বা বড় শিশুর দ্বারা কোন শিশু যৌনতামুলক আচরণের শিকার হয়। যৌন নির্যাতন বলতে বুঝায় কোন শিশুর যৌনতামুলক কাজে অংশগ্রহণ করা যার উদ্দেশ্য কোন ব্যক্তির শারীরিক সন্তুষ্টি লাভ বা বানিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়া। এই ধরনের যৌন নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে কোন শিশুকে যৌনতামুলক কাজ করতে বলা বা চাপ দেওয়া, যৌনাঙ্গের প্রদর্শন করতে বলা বা বাধ্য করা, শিশুকে পর্নো দেখানো, কোন শিশুর সাথে সত্যিকার অর্থে যৌন সঙ্গির মত আচরণ করা, শিশুর যৌনাঙ্গ স্পর্ষ করা বা দেখা বা শিশু পর্নো তৈরী করা। শিশুদের যৌনতামুলক সেবা বিক্রয় করাকে সাধারণ কারাবরোধ নয় বরং শিশু নির্যাতন হিসেবে দেখা হয়।

মানসিক নির্যাতন

অনিচ্চাকৃত নয় এমন মৌখিক এবং অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে শিশুর বাবা-মা বা তত্ত্বাবধানকারী যদি মানসিকভাবে শিশুকে ক্ষতিগ্রস্থা করে বা ক্ষতি হবার সম্ভাবনা তৈরী করে তবে তা মানসিক নির্যাতন ।কেউ কেউ এই সব নির্যাতনকে সামাজিক ও মানসিক দোষ বলে মানেন। শিশু বেড়ে ওঠার সময় যে সমস্ত আচরণ করা হয় যেমন চিৎকার করে কথা বলা বা নির্দেশ দেওয়া, রুক্ষ মেজাজ দেখানো, অমনোযোগি হওয়া, কঠিন সমালোচনা এবং শিশুর ব্যক্তিত্বের উপর দোষারোপ করা। ]অন্যান্য উদাহরণের মধ্যে আছে নাম বিকৃত করে ডাকা, রসিকতা করা, নিচুভাব দেখানো, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ভাংচুর করা, অত্যাধিক সমলোচনা, শিশুর কাছ থেকে সঠিক নয় এমন বা বেশি বেশি আশা করা, কথা বলা বন্ধ করা, এবং নিয়মিত লজ্জা দেওয়া বা দোষ দেখা ইত্যাদি।

২০১৪ সালে, এপিএ বক্তব্য দেয় যে,

  • “শিশু বয়সে মানসিক নির্যাতন শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের মতই ভয়াবহ”
  • “আমেরিকায় বার্ষিক প্রায় ৩ মিলিয়ন শিশু বিভিন্ন ধরনের মানসিক দুব্যবহারের শিকার হয়”
  • মানসিক নির্যাতন হল শিশুর জন্য সবচেয়ে দ্বন্ধতাপূর্ন এবং সর্বত প্রচলিত নির্যাতন এবং অবহেলা”
  • “এই গুরুত্ব হেতু শিশুর মানসিক নির্যাতন এবং এর ফলে সৃষ্ট নির্যাতিত শিশুর কথা বিবেচনা করে এই সমস্যাকে মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা প্রশিক্ষনের সর্বপ্রথম বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা উচিত।”

অবহেলা নির্যাতন

শিশু অবহেলা হল কোন বাবা-মা বা অন্য কোন দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তির কর্তব্য পালন করতে ব্যর্থ হওয়া যেমন প্রয়োজনীয় খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য সেবা বা তত্বাবধানজনিত কাজে অবহেলা করা যার ফলে শিশুর স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিপূর্ণ সুস্থতার ক্ষতি হয় বা হুমকি হয়ে দাড়ায়। অবহেলার মধ্যে আরো আছে শিশু তার চারপাশের মানুষের থেকে মনোযোগ না পাওয়া এবং শিশুর বাচার জন্য প্রয়োজনীয় ও সংযুক্ত অন্যান্য জিনিস না পাওয়া যেটা মনোযোগ, ভালবাসা ও যত্নের অভাবে হয়ে থাকে।

শিশু অবহেলার ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত কিছু বিষয়ের মধ্যে আছে শিশুটি ঘন ঘন স্কুলে অনুপস্থিত থাকছে, খাবার বা টাকা খোজা বা চুরি করা, স্বাস্থ্যজনিত সেবার অভাব ও দাতের অযত্ন, নিয়মিতই অপরিচ্ছন্ন থাকা এবং আবহাওয়া অনুযায়ী পোষাক পরিধান না করা।মানসিক অবহেলা: যত্ন, উৎসাহ এবং সহায়তা প্রদান না করা;শিক্ষাগত অবহেলা স্কুলে অংশগ্রহন করার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ দিতে না পারা এবং ত্যাগ করা কোন শিশুকে দীর্ঘ সময়ের জন্য একা রেখে যাওয়া । মানসিক নির্যাতন, যে শিশুর অবহেলা বা শারীরিক নির্যাতনের ইতিহাস রয়েছে সেই শিশু মানসিক সমস্যায় পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শিশু নির্যাতন আমাদের সমাজে যে কারণে হয়ে থাকে,

  • বাবা-মায়েরা একে অপরকে শারীরিক নির্যাতন (ঝগড়া) করে তারা অন্যদের তুলনায় বেশি শিশুদের নির্যাতন করে।
  • শিশুর আচরণ ঠিক করার জন্য শাস্তি দিতে গিয়ে শারীরিক নির্যাতনের স্বীকার হয় শিশু।
  • সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের ফলে শারীরিক শাস্তি প্রদান শিশু নির্যাতনের আরেকটি কারন।
  • যেসব শিশু অপরিকল্পিত গর্ভধারনের কারনে হয়েছে তারা বেশিরভাগ সময় নির্যাতন অথবা অবহেলার শিকার হয়।
  • শারীরিকভাবে সুস্থ শিশু চেয়ে আংশিক বা সম্পূর্ন প্রতিবন্ধি শিশুকে বেশি নির্যাতন করা হয়। এলিজাবেথ ইয়াং লিখেন,”শিশু নির্যাতনের মূল বাবা-মায়ের মানসিক-শারীরিক অথবা সামাজিক-পারিপার্শ্বিক চাপ (যদিও তা পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না) ইত্যাদির মধ্যে নয়। এটার কারন হল অসুস্থ সংস্কৃতি যা মানুষের মনকে প্রভাবিত করে শিশুকে সম্পদ, যৌন উদ্দীপক বস্তু হিসেবে দেখতে যার ফলে শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের হিংসাত্মক আচরণ এবং লালসার শিকার হচ্ছে।”

ইতি কথা, শিশু নির্যাতন হল একটি আন্তর্জাতিক বিষয়। ইহা নিয়ে গবেষণা চলছে কিভাবে এই সমস্যা থেকে মুক্ত হতে পারি। তবে সব সমস্যার সমাধান আমার কাছে একটা সহজ উপায় আছে, সমস্যা খুঁজে বের করে, সচেতন হওয়া। পৃথিবীর জন্মের সময় এতো সমস্যা ছিল না, সমস্যা আমরা তৈরি করেছি, আমাদের সচেতনায় পারে সমস্যা সমধান করতে ।

 

লেখকঃ মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান

 


আরও পড়ুনঃ

8,331 total views, 1 views today

Facebook Comments

আরও অন্যান্য লেখা