স্বাস্থ্য তথ্য 

শিশুরাই এখন হাঁপানিতে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ,আপনার শিশুটি কি নিরাপদ? জেনে নিন।

হাঁপানি বা অ্যাজমা একটি পরিচিত রোগ, যা ফুসফুসের বায়ুনালির মধ্যে বাধা সৃষ্টি করে। আমরা যখন নিশ্বাস নিই তখন বাতাস শ্বাসনালির বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা দিয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করে, তারপর বেরিয়ে আসে। হাঁপানি রোগীর ক্ষেত্রে বাতাস চলাচলের এই পথগুলো বিভিন্ন কারণে সংবেদনশীল হয়ে সরু হয়ে পড়ে। ফলে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
এ বিষয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র রায় বলেন, সবচেয়ে বেশি অ্যাজমা দেখা যায় অ্যালার্জিক কারণে। শিশুরাই এখন হাঁপানিতে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। শীতে হাঁপানি-আক্রান্ত শিশুরা বেশি সংকটের সম্মুখীন হয়। চিকিৎসকের পরামর্শমতো চললে একে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।Image result for child asthma

প্রধানত তিনটি কারণে
১. বিভিন্ন রোগজীবাণুর সংক্রমণে শ্বাসনালির ভেতরের স্তরে প্রদাহ হয়ে ফুলে ওঠে।
২. শ্বাসনালির চারপাশের মাংসপেশি সংকুচিত হয়, ফলে বাতাস চলার পথ সরু হয়ে যায়।
৩. উত্তেজক পদার্থের প্রভাবে শ্বাসনালির গ্রন্থি থেকে প্রচুর মিউকাসজাতীয় আঠালো কফ নিঃসৃত হয়ে শ্বাসনালিতে জমা হয়। ফলে বাতাস চলাচলের পথ আটকে দেয়। যার ফলে অল্প বাতাস সরু শ্বাসনালি দিয়ে প্রবাহের সময় শ্বাসের সঙ্গে শোঁ শোঁ শব্দ হয়।

কী কারণে হাঁপানি হয় বা কীভাবে শুরু হয়?
শিশুকাল থেকেই শুরু হয় এবং রক্তসম্পর্কের আত্মীয় থেকে বা বংশানুক্রমে চলতে থাকে।
অনেক কিছুতেই হাঁপানির আক্রমণ শুরু হতে পারে। যেমন: বাড়িঘরের ধুলো-ময়লায় থাকা মাইট, উগ্র গন্ধ বা স্প্রে, সিগারেট বা অন্যান্য ধোঁয়া, পরাগ বা ফুলের রেণু, পশুপাখির পালক, লোমশ খেলনা, ছত্রাকের স্পোর, আবহাওয়ার পরিবর্তন, ঠান্ডা লাগা, বিশেষ কিছু খাদ্য, কিছু কিছু ওষুধ যেমন অ্যাসপিরিন, পেনিসিলিন প্রভৃতি, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কোনো কোনো রাসায়নিক পদার্থ, শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম প্রভৃতি। আজকাল দূষিত বাতাস গ্রহণের জন্য শিশুদের মধ্যে হাঁপানির প্রকোপ দিন দিন বেড়েই চলেছে।Image result for child asthma

লক্ষণ বা উপসর্গ
* বুকে আঁটসাঁট, দম খাটো অর্থাৎ ফুসফুস ভরে দম নিতে না পারা।
* শ্বাস নিতে ও ছাড়তে কষ্ট অনুভব করা।
* বুকের ভেতর বাঁশির মতো শব্দ হওয়া।
* ঘন ঘন শুষ্ক কাশি, গলার নিচের অংশ এবং দুই পাঁজরের নিচের ও মধ্যবর্তী অংশ শ্বাস নেওয়ার সময় ভেতরে ঢুকে যাওয়া, চিত হয়ে শুয়ে থাকতে না-পারা এবং ঘুম থেকে উঠে বসে থাকা, সর্দি লাগার পর শ্বাসকষ্ট অনুভব করা। এসব উপসর্গ সাধারণত রাতে বাড়ে।

হাঁপানির চিকিৎসা
* নানা রকম ওষুধ রয়েছে। সাধারণত দুই ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। দ্রুত আরামদায়ক ওষুধ বা ব্রঙ্কোডাইলেটর, যা শ্বাসনালির সংকোচন রোধ করে দ্রুত শ্বাসকষ্ট লাঘব করে।
* শ্বাসনালির প্রদাহ নিরাময় ওষুধ দেওয়া হয়। প্রতিষেধক ওষুধগুলো ধীরে ধীরে কাজ করে এবং শ্বাসনালির সংকোচন ও প্রদাহ থেকে শ্বাসনালিকে রক্ষা করে। প্রতিষেধক ওষুধগুলো হাঁপানিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
* ওষুধের পাশাপাশি ভ্যাকসিন দিয়ে রোগীকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা সম্ভব হয়।

প্রতিরোধ
* একটি শিশু আলাদা ট্রিগার বা উত্তেজকের প্রতি সংবেদনশীল। শিশুর যদি হাঁপানি থাকে, তাহলে শিশুর হাঁপানির ট্রিগারগুলো চিনে নিয়ে সেগুলো যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি।Related image
* শীতে ঠান্ডা লাগা থেকে দূরে থাকতে হবে।
* পুরোনো কাপড় পরার আগে ভালো করে ধুয়ে নিয়ে হবে।
* কাপড়ে ডাস্ট, মাইট যাতে না থাকে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে।
* হাঁপানিতে আক্রান্ত শিশুর বাবা-মায়ের ধূমপান করা উচিত নয়। কারণ সিগারেটের ধোঁয়াও অ্যাজমার কারণ হতে পারে।
* শিশুর হাঁপানির ওপর খাবারের প্রভাব আছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যদি দেখা যায় বিশেষ কোনো খাবার খেলে শিশুর হাঁপানির সমস্যা হয় তাহলে সেসব খাবার শিশুকে খেতে দেওয়া যাবে না।
* শিশুকে সব সময় পরিষ্কার থাকতে উৎসাহিত করুন। তাকে ধুলাবালু, জীবজন্তু, লোমশ খেলনা দিয়ে খেলতে বারণ করুন।
* চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে সাধারণ ব্যায়াম করতে উৎসাহিত করুন।
* চিকিৎসকের পরামর্শমতো চললে এবং চিকিৎসা করালে হাঁপানিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং আনন্দময়, কর্মক্ষম জীবনযাপন করা যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত চিকিৎসা করালে শিশুর যেসব সুফল পাওয়া যাবে তা হলো হাঁপানির লক্ষণ একেবারে চলে যাবে, বড়জোর দিনের বেলায় সামান্য লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কোনো কষ্ট ছাড়াই রাতের বেলায় শান্তিতে ঘুমাতে পারবে। কখনো লেখাপড়ার সমস্যা হবে না। শারীরিক কাজকর্মে কোনো ব্যাঘাতও হবে না।

কিছু কথা
হাঁপানি ছোঁয়াচে রোগ নয়। এটি সর্দি-কাশির মতো নয়, একজনের হলে অন্যজনের মধ্যে ছড়াবে না। অ্যাজমায় আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধ খেলে শিশুর অ্যাজমায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। এটি বংশগতভাবে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
শিশু স্কুলে গেলে তার হাঁপানির সমস্যা শিক্ষককে জানান, শিশুর হাঁপানির লক্ষণগুলো নিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করুন। স্কুল বা ভ্রমণকালে শিশুর প্রয়োজনীয় ওষুধপথ্য সঙ্গে রাখুন।


মো. শরিফুল ইসলাম

লেখক: চিকিৎসক

মূল লেখাঃ দৈনিক প্রথম আলো


আরও পড়ুনঃ

2,428 total views, 1 views today

Facebook Comments

আরও অন্যান্য লেখা